দিনমজুর হান্নানের স্ত্রী সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিবে কে?

প্রকাশিত: ২:৪১ পূর্বাহ্ণ, মে ৭, ২০২১

শ্রমিক অধ্যুসিত কোম্পানীগঞ্জে ঈদ আসলেই যেন নিরব এক দূর্ভিক্ষের সাথে মুখোমুখি হতে হয় শ্রমজীবি পরিবারের কর্তাদের।পরিবারের কর্তাদের একদিকে ক্ষুধার জ্বালা মেটানোর জন্যে চিন্তা করতে হয়, অন্যদিকে সন্তানের মুখে হাসি দেখতে প্রচলিত আইন/নির্দেশ অমান্য করার দায়ে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ক্ষুধার জ্বালা বনাম সন্তানের মুখে হাসি।এই দুইয়ের প্রতিযোগীতা চলে কোম্পানীগঞ্জের শ্রমিকের ঘরে ঘরে। আর এক সপ্তাহ পরে ঈদ উল ফিতর।উপজেলার ক্ষুধার্থ পয়সা ওয়ালার ছেলেরা সিলেটের এক শপিংমল থেকে অন্য শপিং মলে ঘুরছে পছন্দের কেনাকাটা করতে।অন্যদিকে দিনমজুরের ছেলেরা ঈদের দিনে সেমাই খাওয়ার লোভে জীবনের ঝুকি নিয়ে পাথর উত্তোলন করতে যায়।পাথরই অত্র উপজেলার একমাত্র রুটিরুজি।সন্তানের শাক-ভাতের উপায় করতে শ্রমিকরা পাথরের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ পায় না।

বৃহস্পতিবার (০৬ মে) উপজেলার শাহ আরফিন টিলার বন্ধ থাকা পাথর কোয়ারীতে কাজ করতে গিয়ে মান্নান মিয়া (৪৫) নামের এক পাথর শ্রমিক পুলিশের হাতে আটক হয়।মান্নান  ৫ শত টাকা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন।স্থানীয় কোনো এক পয়সা উয়ালা কোয়ারি মালিকানাধীন গর্তে সে কাজ করতে গিয়েছিল।পরিবারের অভাব ঘুছাতে আর আল্লাহর দেওয়া পেটের ক্ষুধা মেটাতে,  স্বীয় অপরাধ জেনেও বন্ধ থাকা কোয়ারীতে
কাজ করতে গিয়েছিল।দিনশেষে কাজ করলে যা হাতে পাবে তাই দিয়ে পরিবারের জন্যে আহার কিনে নিয়ে যেতো।অথচ অর্ধেক দিন কাজ করার পড়ে সে পুলিশের কাছে আটক হয়েছে।এখন গর্তের মালিক কি তার অর্ধেক দিনের মুজুরি দিবে?তার পরিবারের আহার যোগান দিবে?

যখন সে পুলিশের হাতে আটক হয়েছে তখন মধ্য বিকেল। পুলিশের হাতে তার আটকের খবরটি পরিবারের কানে যাওয়ার পর কি অবস্থা হয়েছিল তাদের খবর জানেনা কেউ। তার পরিবারের সদস্যরা দুইটি বিষয় নিয়ে উদ্ভেগ উৎকন্ঠায় দিন পার করেছে।

এক, পরিবারের প্রধান কর্তা এখন জেলে চলে যাবে।দুই, একমাত্র রোজগার করা ব্যক্তিটি জেলে যাওয়ায় তাদের আহারের যোগান নিয়ে চিন্তিত?না দিবে গর্তের মালিক।না খবর রাখবে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটানোর দায়ে অপরাধীকে আইনের কাছে সোপর্দ হতে হয়।শাস্তি মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু পুলিশ যখন মান্নানকে ধরে নিয়ে গেলো তার পরিবারেও যখন খাদ্য শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে তার জন্যে কি তারা শাস্তি পাবে?তাদের আহারের যোগান দেবে?

হান্নান জেলে গেলেও তার পরিবারের আরেকজন সক্ষম ব্যক্তি আছে,  সে হলো তার স্ত্রী।৫ টি সন্তানের পেটের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে তার স্ত্রীও হয়তো শাবল হাতে ৫ শত টাকা দৈনিক মুজুরির কাজ করতে বন্ধ থাকা শাহ আরফিন টিলার লাল মাটিতে পা রাখবে।

সামনে ঈদ উল ফিতর।মান্নানের ছোট ছোট সন্তানেরা আর সেমাই খেতে চাইবেনা।কারন সেমাই কেনার টাকা জোগার করতে গিয়ে তার পিতা হান্নান এখন পুলিশের কাষ্টরিতে আছে, জেলে যাওয়ার প্রহর গুনছে।

পুলিশ যখন দিনমজুর হান্নানের বিরুদ্ধে পাথর চুরির মামলা ঠুকবে।পয়সা উয়ালা গর্তের মালিক তখন পলাতক।হয়তো মাস কয়েক জেল খেটে দিনমজুর মান্নান জামিনে ছাড়া পাবে।এসে দেখবে,খাদ্যের অভাবে ক্ষুধায় থেকে থেকে  তার আদুরের দুলাল-দুলালির হার হাড্ডি বের হয়ে এসেছে।তখন আবারও শাহ আরফিন টিলায় পা বারাবে সে।দৈনিক মুজুরি ভিত্তিতে কাজ করেও হান্নানরা বার বার চুরির মামলা খাবে।ধার দেনা করে আদালত থেকে আবারও জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসবে।আর পয়সা উয়ালা গর্তের মালিকরা পুলিশের বড় কর্তাদের সামনে বুক চেতিয়ে ঘুরে বেড়াবে।

অভাবে অনটনে থাকতে থাকতে আদালতে হাজির না হওয়ায় এক সময় মান্নানের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট কিংবা সম্পদ ক্রোকের আদেশ আসবে।তখন পুলিশ ও আদালতের শাস্তির ভয়ে হান্নান বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকবে। তখন তার পরিবারের আরেকটি স্থায়ী দূর্ভিক্ষ চলে আসবে।এইরকম শত শত দিনমজুর হান্নানরা পুলিশের খাতায় পাথর চোর কিংবা পাথর খেকু হয়ে বেচে আছে।বেচে থাকবে।

গ্রামের কোনো এক মুরুব্বির বলেছিল
দেশের প্রচলিত আইন শুধু গরীবের জন্যেই!

(সি/স-০৭ মে-তা/ই)