উপেক্ষিত কোম্পানীগঞ্জের অর্ধলক্ষ পাথর শ্রমিক

প্রকাশিত: ৮:০৯ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২০

সম্পাদকীয়:- আজ মহান মে দিবস । দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন। দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন শ্রমিকরা। ১৪৪ বছর আগে আজকের এই দিনে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের অধিকারের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্প এলাকায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। আন্দোলন চলাকালে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে বিশাল শ্রমিক জমায়েতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১১ শ্রমিক। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে ওই শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। অধিকার আদায়ে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের সব দেশেই দিবসটি পালন করা হয়।

 

দিনটি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের চরম আত্মত্যাগে ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক অবিস্মরণীয় দিন।প্রতিবছর রাষ্টীয়ভাবে দিবসটি পালন উপলক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও এবার করোনার কারণে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি।

সমগ্র দেশের ন্যায় কোম্পানীগঞ্জেও নীরবেই শ্রমিক দিবসটি পার হয়েছে।শ্রমিক নেতাদের মধ্যে নেই কোনো দাবিদাওয়ার আন্দোলন।নেই কোনো শ্রমিক মিলন মেলার আয়োজন।থাকবেইবা কেমন করে?এই উপজেলায় শ্রমিক সংগঠননের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের নিয়ে কখনো কোনো দিন বিশেষ দিবস কিংবা উৎসব পালিত হয়নি।

করোনার কারনে এ বছর কোন কর্মসূচী না থাকলেও প্রতিবছর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাধারণ ভাবেই পালিত হয়েছে এই দিবসটি।

শ্রমিকদের জন্যে আজকের এই দিনটি বিশেষ একটি দিন কিন্তু সেই খবর এই উত্তর পূর্ব সিলেটের খেটেখাওয়া শ্রমিকরা খুব কমই যানে।

দেশজোরা খ্যাতি উত্তর পূর্ব সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে নিয়ে, যার জন্যে এই খ্যাতি ছড়িয়েছে তা কেবলই খনিজ শিল্প পাথর কোয়ারীকে নিয়ে।ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী,উৎমা পাথর কোয়ারী ও শাহ আরফিন পাথর কোয়ারীর মত বড় বড় পাথর কোয়ারী থেকে দৈনিক লক্ষ লক্ষ ঘনফুট পাথর উত্তোলন হতো। আর এই পাথর দেশের সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজে ব্যাবহার করা হয়।এই পাথর খনির সাথে জড়িয়ে ছিল কয়েক লক্ষ পরিবারের অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান,শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যায় ভার মেটানোর একমাত্র উপায়।দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক শ্রমিক এই শিল্পের সাথে জড়িত থাকলেও দিনে দিনে এই শিল্পকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে কিছু সংস্থা ও পরিবেশ আন্দোলনের সাথে জড়িত কিছু বিপদগামী নেতা কর্মী।এছারাও এই পাথর কোয়ারীর সুনাম ও পাথর উত্তোলন কর্মকান্ড ধ্বংস করতে জড়িত আছে স্ব স্ব এলাকার কিছু স্বার্থন্বেশী রাজনীতিবিদ ও ব্যাবসায়ী মহল।

সিলেটের চাঙ্গা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দূর্বল করে রাখতে দেশের কয়েকটি সংস্থা তোরজোর চালাচ্ছে।সিলেটের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির অন্যতম উৎস বিভিন্ন খনিজ উত্তোলনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ।তার মধ্যে পাথর অন্যতম।কিন্তু এই খনিজ সম্পদ পাথর শুধু সিলেটের দারিদ্রপিরিত অঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি,বরং সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজেলার খেটে খাওয়া মানুষের জীবন জীবিকা এই শিল্পের সাথে জড়িত আছে।

যথেষ্ট পরিমান পাথর উত্তোলন হতে থাকলে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের পাশা-পাশি বিভিন্ন স্থাপনা,রাস্তাঘাট নির্মানে ব্যায় কমে আসবে। সব কিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষ দারিদ্রতা ঘুছিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরাতে পারলে সরকারও তার বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যায়ভার কমিয়ে দেশের সম্পদ রক্ষা করতে পারে।একটি দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাইলে অবশ্যই সে দেশের সাধারণ নাগরিককে দৈনন্দিন আর্থিক আয়ের পথ তৈরী করে দিতে হবে,তবেই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে।কিন্তু সরকার সাধারণ জনগনের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা না করেই হুুট করে বন্ধ করে দিয়েছে সিলেটের কোয়ারীগুলো।করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে সমগ্র দেশে লকডাউন চলছে।কিন্তু কোম্পানীগঞ্জের শ্রমজীবীদের ঘরে গত ৪ মাস ধরেই লকডাউন চলছে।

দেশের বিত্তশালী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যেখানে এই করোনাদূর্যোগের সময়ে নানান সঙ্কায় দিন পার করছে সেখানে দৈনিক মজুরীখাটা মানুষগুলোর রান্নার চুলায় দিনে একাবারের জন্যেও আগুন জ্বলছে কিনা সেই খবর কে রাখে?

কোয়ারী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক শ্রমিক।দেশে যেখানে জিডিপি’র গড় হার বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে সেখানে সিলেটে লক্ষাধিক শ্রমিক বেচে থাকার তাগিদে লড়াই করে যাচ্ছে দারিদ্রতার বিরুদ্ধে।শহরের জিডিপি’র গড় হার বৃদ্ধি পেলেও মফস্বলের ক্ষুধার্তদের মিছিল ভারি হচ্ছে “কাপড় চাই না ভাত চাই” দাবীর নিরব আন্দোলনে।গত ৩০ বছর ধরে সিলেটের কর্মসংস্থানের মাধ্যম যাচাই করে দেখলে বুঝা যায় (এলিট পার্সনদের বাদ দিলে) শ্রমিকেদের অন্যতম প্রধান পেশা পাথর কোয়ারীরতে শ্রমদান।কিন্তু দেশের একটি পক্ষ এই খেটে খাওয়া শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করে না দিলেও খুলে দিয়েছে দারিদ্রতার দরজা।দীর্ঘদিনের পেশা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে চুরি,ডাকাতি,মাদক ব্যাবসা ইত্যাদিতে জরিয়ে পরছে।দেশের আইনশৃঙ্খলাকে নাকানি চুবানি দিচ্ছে।কোম্পানীগঞ্জে শ্রমিকদের যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরী হলে আইনশৃঙ্খলা এমনিতেই উন্নতি হবে।তাই কোম্পানীগঞ্জের আইনশৃংঙ্খলা রক্ষায় শ্রমিকের কর্মসংস্থান পাথর কোয়ারীগুলি খুলে দেওয়া হোক।

পরিবেশবিদদের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন তখনই সফল হবে,যখন দেশে দারিদ্রতার হার শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।দেশের জনগনকে দারিদ্রতার দিকে ঠেলে দিয়ে কখনো পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন করে লাভ হবে না ।পরিবেশ রক্ষা করার পর দেখা যাবে শ্রমিকের ঘরে ঘরে দারিদ্র্যতার কুঠার নগ্নতা হানা দিয়েছে।শ্রমিকের ঘরে দারিদ্রতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে তখন তারা পরিবেশ নিয়ে বাচাঁর চেষ্টা করবে ঠিকই কিন্তু পরিবেশমত মরতেও পারবেনা।

করোনা পরবর্তি সময়ে কোম্পানীগঞ্জের পাথর কোয়ারীগুলো না খুলে দিলে শ্রমিকদের পেটের আগুন কে নিভাবে?সরকার চাইলে পরিবেশ রক্ষা করেও কোয়ারী খুলে দিতে পারে। বিগত ৬/৭ বছর ধরে সিলেটের কোয়ারীগুলো বন্ধ থাকায় শ্রমিকের ঘরে ঘরে দারিদ্রতা দূর্ভিক্ষাকারে দেখা দিয়েছে।এরই মধ্যে বৈশ্বিক করোনা হানা দিয়েছে বাংলাদেশে।দেশের প্রতিটি নাগরিককে খাদ্যের জোগান দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশে করোনাদূর্যোগ ঠেকাতে লকডাউন কার্যক্রম যদি দীর্ঘস্থায়ীভাবে কার্যকর থাকে তবে রাষ্ট তার নাগরিকদেরকে কত দিন খাদ্যের জোগান দিয়ে যেতে পারবে?

দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাতে ভেঙ্গে না পড়ে বাংলাদেশ সরকার সেই জন্যে করোনার প্রভাব বিস্তার চলাকালীন সময়ের মধ্যেও সীমিত আকারে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।কিন্তু সিলেটের প্রধান শিল্প পাথর ব্যবসা আজ ৪ মাস যাবত স্থবির হয়ে পড়েছে।বিভাগের লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে আছে।কোথায় সেই সরকারী নীতি?একই দেশে দুই নীতি কিভাবে মানবে জনগন?বেকার হয়ে পড়া পাথর শ্রমিকদের জন্যে এই ৪ মাসে সরকারের পক্ষ থেকেতো কোন নীতি ঘোষণা করেনি?

বাংলাদেশ সরকারের প্রজ্ঞাপনের ৯৫ বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে,

যথা সময়ে সিলিকা বালু, সাধারণ পাথর এবং বালু মিশ্রিত পাথর ইত্যাদির

কোয়ারি ইজারা প্রদান করা না হলে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক খনিজ সম্পদ

ব্যুরোর পক্ষে কোয়ারী এলাকার খাস ভূমি ইজারা দিয়ে অর্থ আদায় করে খনিজ

সম্পদ ব্যুরোর নির্দ্দিষ্ট কোডে জমা দেবেন। অথচ এ প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে

কোয়ারি বন্ধ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ কোয়ারী ইজারাও দিচ্ছেন না,

খাস আদায়ের মাধ্যমে কোয়ারী খুলে দেওয়া হচ্ছে না। এতে করে উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক পরিবারের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ এ কোয়ারি

খুলে দিতে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন ছোট বড় খাতকে আবারো উজ্জিবিত করে গড়ে তুলতে সরকার ৭২ হাজার ৫০০ শত কোটি টাকার প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে ।দেশের প্রধান প্রধান শিল্পকারখানাগুলো করোনা পরবর্তি সময়ে এই প্রনোদনার অর্থ পেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে থাকলেও অপ্রস্তুত রয়েছে সিলেটের পাথর শিল্পগুলো।অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে এই পাথর শিল্পের ভাগ্য।
করোনাপরবর্তি সময়ে সিলেটের পাথর কোয়ারীগুলো পূনঃরায় না খুলে দিলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গেই পড়বে নিশ্চিত বলা যায়।শ্রমিকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে দারিদ্র। ক্ষুন্ন হতে পারে শ্রমিক পরিবারের অন্য আরো ৪ টি মৌলিক অধিকার।এই অঞ্চলে যদি অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং খাদ্য সঙ্কট চরম আকার ধারণ করে তবে কে নিবে এই দায়িত্বভার? নৌকায় ভোট দিলে কোয়ারী খুলে দিবে আস্বাস দেওয়া আওয়ামীলীগ নেতারা?এই আসনের এমপি মহোদয়?নাকি দেশের সরকার?

তারিকুল ইসলাম
সাংবাদিক,কলামিস্ট
কোম্পানীগঞ্জ,সিলেট