সেদিন উপস্থিত জনতা লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল মেরেই ইংরেজদের হঠাতে পারতো শের তারিকুল শের তারিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২২ আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে দেশীয় বণিক, বিশ্বাসঘাতক ও ইংরেজ বেনিয়াদের চক্রান্তে পলাশীর প্রান্তরে ২০০ বছরের জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। যুদ্ধের নামে চলে প্রহসন। মাত্র এক ঘণ্টায় পতন হয় বাংলা, বিহার ও ওডিশার নবাব সিরাজউদ্দৌলার। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-ওডিশার সিংহাসনে বসেন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের শুরু হয়। সিংহাসনের জন্য লালায়িত তখন অনেকে। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিরাজের মাতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ তরুণ নবাবকে হটাতে এক প্রস্তাব পাস করা হয়। এ প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমি চাঁদকে এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করেন। ইতিহাসের ভাষ্য, “২৩ জুন সকালেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। ইংরেজরা ‘লক্ষবাগ’ নামক আমবাগানে সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। সকাল আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেয়। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন, সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলে মীর মদনই হয়তো ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলা–বারুদ ভিজে যায়। তবু সাহসী মীর মদন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু গোলার আঘাতে মীর মদন মৃত্যুবরণ করেন। মীর জাফর এবার বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সৈন্যবাহিনীকে শিবিরে ফেরার নির্দেশ দেন। এই সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা নবাবকে আক্রমণ করেন। যুদ্ধ বিকেলে শেষ হয় এবং নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপিয়ান এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যও কেউ তাকে সাহায্য করেনি।” ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌলাকে মহানন্দা নদীর পাড় থেকে বন্দি হন। তাকে আনা হয় রাজধানী মুর্শিদাবাদে। তখন নবাবের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী লুৎফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ৪ জুলাই (মতান্তরে ৩ জুলাই) মীর জাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে আরেক বিশ্বাসঘাতক মোহাম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেন। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলীবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদদের কাছে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার কারণ বিস্ময়কর। কারণ এ যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের মাত্র ৩ হাজার ২০০ সৈন্যের কাছে সিরাজউদ্দৌলার ৫০ হাজার সৈন্যের পরাজয় ঘটে। পলাশী যুদ্ধ সম্পর্কে রবার্ট ক্লাইভের আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়, “সেদিন স্থানীয় অধিবাসীরা ইংরেজদের প্রতিরোধ করতে চাইলেই লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল মেরেই তাদের খতম করে দিতে পারতেন। কিন্তু এ দেশবাসী তা উপলব্ধি করতে পারেননি।” সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা চক্রান্তকারীদের ভোগ করতে হয়েছে মর্মান্তিক পরিণতি। মীর জাফর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। ক্লাইভ করেন আত্মহত্যা। তবে সিরাজউদ্দৌলা বীর হয়ে আছেন ইতিহাসে। তিনি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি বাঙালির কাছে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছেন। পলাশীর দিবস সেই শিক্ষাটাই আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: