কোম্পানীগঞ্জে ভারতীয় পণ্য চোরাচালানে জড়িত কারা?

প্রকাশিত: ১১:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের বটেরতল গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারত থেকে আসা ক্ষতিকর ওষুধসামগ্রী জব্দ করেছে পুলিশ। এ সময় দুইজনকে আটক করা হয়েছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোম্পানীগঞ্জ থানার সাব ইন্সপেক্টর জগৎ জৈতি দাশের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম অভিযান দিয়ে ভারতীয় এসব ক্ষতিকর সামগ্রী জব্দ করেন। এ সময় মৃত লাল মিয়ার সারোয়ার জাহান (৩০)কে তার বসতঘর থেকে ভারতীয় এসব ক্ষতিকর সামগ্রী সহ আটক করে লন। আটক ব্যাক্তিদের মধ্যে অন্যজন পারুয়া কালাসাদক গ্রামের ময়না মিয়ার ছেলে মাহমুদুল হাসান রাব্বি ধারণা করা যাচ্ছে জব্দকৃত এসব ক্ষতিকর ঔষধসামগ্রীর মূল্য প্রায় ১০ লক্ষ টাকা সমমূল্যের হবে।

পুলিশ অভিযানের সময় সারোয়ারের বসতবাড়ির বারান্দায় রাখা ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লেখা ২৯ কার্টন বিভিন্ন ধরনের ওষুধসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করে পুলিশ।

যে পথে আসছে এসব ভারতীয় ক্ষতিকর ঔষধ সামগ্রী।

দীর্ঘদিন যাবত উপজেলার সীমান্তঘেষা ছনবাড়ী রুটে ১২৪৬ নং পিলার দিয়ে এসব মালামাল চোরাচালান হয়ে আসছিল। এসব রুটে ঔষধসামগ্রী ছাড়াও, ভারতীয় শাড়ি লেহেঙ্গা,কসমেটিক্স, চোরাই মোটরসাইকেল, মোটরপার্স, টায়ার, চশমার ফ্রেম, ফুচকা সহ ১৫/১৬ টি ভারতীয় পণ্য চোরাচালান হয়ে আসছে। সিলেটের বাইরে থেকে আসা চোরাকারবারিরা উপজেলার চোরাকারবারিদের অর্থ বিনিয়োগ করেন। স্থানীয় চোরাকারবারিরা ভারত থেকে এসব পণ্য এনে নিরাপদ স্থানে মজুদ রেখে সুযোগ বুঝে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান সহ বালু ও পাথরের ট্রাকে করে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়। এছাড়াও চিকাডহর ও ছনবাড়ী গ্রামের মাঝ দিয়ে মুইট্টা টিলা নামক স্থান দিয়ে দেদারসে প্রবেশ করছে এসব পণ্য।

কোন রুটে আসছে এসব পণ্য? 

সীমান্ত পেরিয়ে প্রথমে ছনবাড়ী ও মুইট্টা টিলার নিরাপদ স্থানে এসে মজুদ রাখা হয়। এরপর ট্রাক্টর দিয়ে বাহাদুরপুর-নভাগি রুট ব্যবহার করে বটেরতল গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু গোডাউনে মজুদ রাখেন।এছাড়াও শাহ আরফিন বাজার-জালিয়ারপাড়-বাবুলনগর-নভাগি রুট ব্যবহার করে এসব পণ্য আসছে বটেরতল গ্রামে। চোরাকারবারিদের জন্য বটেরতল গ্রামটি সেইফজোন। নিরিবিলি ও রাস্তারপাশে হওয়ায় বটেরতল গ্রামকে বেছে নিয়েছে চোরাকারিরা।এখান থেকেই বিভিন্ন পরিবহনমাধ্যমে পৌছে যাচ্ছে এসব পণ্য।

কিভাবে আসছে এসব ভারতীয় পণ্য?

প্রথমে চোরাকারবারিরা সীমান্তরক্ষী বিজিবির সোর্সদের হাত করে। এরপর বিজিবির গতিবিধি নজরদারীতে রাখেন। সুযোগ বুঝে বিজিবির টহলের ফাক গলিয়ে এসব পণ্য দেশে প্রবেশ করাচ্ছেন। তবে অধিকাংশ সময় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাদের টহল গাফিলতির সুযোগে এসব পণ্য সহজে শুল্ক ফাকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে।

যেভাবে প্রবেশ ঠেকানো যাবে।

সীমান্ত পাহাড়ার সময় বিজিবিকে আরও তৎপর হতে হবে। রাত্রীকালিন নিয়মিত টহল বাড়াতে হবে। অরক্ষিত ভারতীয় কাটাতার কিংবা পানি প্রবাহের চাকাসদৃষ্য পাইপের সামনে স্থায়ী টহল বসাতে হবে। সোর্স নির্ভরতা কমিয়ে বিজিবির প্রশিক্ষিত সদস্যদের দিয়ে সোর্সিং করাতে হবে।

পুলিশের হাতে ভারতীয় এসব পণ্য আটক হয় যেভাবে।

পুলিশের বিভিন্ন শ্রেণীর সোর্স অধিকাংশই চোরাচালানে জড়িত। চোরাকারবারিরা অধিক মুনাফার লোভে প্রতিপক্ষ চোরাকারবারিদের চোরাচালান পুলিশকে ধরিয়ে দেওয়ার সুযোগ খুজে। পুলিশ সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাঝেমধ্যে চোরাচালান আটক করেন। তবে অধিকাংশ চোরাচালান পুলিশের নজরদারী এরিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌছে যায়।

পুলিশের অভিযানে আটক হয় কারা?

পুলিশ মুলত চোরাচালানের সাথে জড়িত শ্রমিকদেরকেই আটক করেন। প্রকৃত মালিকদের আটক করতে ব্যার্থ হওয়ার ঘটনাই বেশী। অধিকাংশ এজাহারে প্রকৃত মালিকরা বেচে যায়। ফেসে যায় শ্রমিকরা।

এর সাথে জড়িত কারা?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা অথবা তাদের ভাই ভাতিজা ও আত্মীয় পরিচয়দানকারী ব্যক্তিরা এসব অপকর্মে জড়িত। তারা নিয়মিত থানায় যোগাযোগ রাখেন।। পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন।সূত্র বলছে ৩১ আগস্ট তারিখে আটককৃত এসব ভারতীয় পণ্যের মালিক জাকারিয়া নামে এক চোরাকারবারি। তার সাথে জড়িত আরও ৫/৬ জন। দীর্ঘ কয়েক বছর যাবত তারা এ অপকর্মের সাথে জড়িত। তাদের পুলিশের অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজেস থাকার তথ্য মিলেছে। যার কারনে বিভিন্ন সময় ভারতীয় চোরাচালান পুলিশের হাতে আটক হলেও অদৃশ্য কারনে তাদের নাম গোপনেই থেলে যায়। ফেসে যায় চোরাচালান শ্রমিকরা।

পুলিশি অভিযানে সফলতা আসবে যেভাবে।

পুলিশকে সোর্স নির্ভরতার পাশাপাশি নিজস্ব অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্যদের মাঠে নামাতে হবে। পুলিশ চেকপোস্টে স্ক্যানিং মেশিন বসাতে হবে। অধিকাংশ চোরাচালান বালু পাথরের ট্রাক দিয়ে পরিবহন হয়। এর সাথে জড়িত ট্রাকের মালিক, ড্রাইভার, ফেলুডার ড্রাইভার ও অসাধু কিছু পুলিশ সদস্য। এছাড়াও পর্যটকবাহী মাইক্রোবাস ও বাসকে চেকিংয়ের আওতায় আনা উচিত। সম্প্রতি এসব বাস ও মাইক্রোবাসে ভারতীয় শুল্ক ফাকি দেওয়া পণ্য সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে।