২৫ জাতের ধান উদ্ভাবন করে ২১ বছরেও সরকারী স্বীকৃতি মিলেনি

প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
Oplus_131072

 

সংবাদ ডেস্ক: আধুনিক গবেষণাগার, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কিংবা পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়াই দীর্ঘ ২১ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় ২৫টি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার প্রান্তিক কৃষক সেন্টু কুমার হাজং। নিজের মাত্র ১২ কাঠা জমিকে গবেষণার ক্ষেত্র বানিয়ে তাঁর এই অসামান্য সাফল্য স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তবে এত বড় অর্জনের পরও এখন পর্যন্ত মেলেনি বড় কোনো সরকারি স্বীকৃতি।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু কুমার হাজং কৃষিতে নতুন জাত উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু করেন ২০০৫ সালে। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু এসএসসি পাসের পর আর্থিক সংকটের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে মাত্র দুই কাঠা জমিতে গবেষণা শুরু করেন তিনি।

বর্তমানে তাঁর ১২ কাঠা জমিতে প্রায় ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট রয়েছে। প্রাকৃতিক সংকরায়ণ ও বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তিনি উদ্ভাবন করেছেন ‘সেন্টু-১’ থেকে ‘সেন্টু-২৫’ নামের ২৫টি ধানের জাত। একটি নতুন জাত উদ্ভাবন, পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে তাঁর প্রায় সাত বছর সময় লাগে বলে জানা গেছে।

সেন্টু হাজংয়ের দাবি অনুযায়ী, তাঁর উদ্ভাবিত কয়েকটি ধানের জাত সাধারণ জাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ফলন দিতে সক্ষম। এসব জাতের ভালো ফলনের কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে বীজের চাহিদাও বাড়ছে। শেরপুরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরাও তাঁর কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করছেন।

স্থানীয় কৃষক সুমন্ত বর্মণ জানান, সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাত চাষ করে সাধারণ বীজের তুলনায় বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ঝিনাইগাতীর কৃষক ওসমান গণি জানান, সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত জাতগুলোর বীজের চাহিদা শুধু শেরপুরেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরাও এসব বীজ সংগ্রহ করছেন।

ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি দেশীয় ও হারিয়ে যেতে বসা ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু হাজং। তাঁর সংরক্ষণ কার্যক্রমে রয়েছে বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নির মতো ঐতিহ্যবাহী ধানের জাত। তাঁর উদ্ভাবিত ‘সেন্টু শাইল’ জাতটিও স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সম্প্রতি সেন্টু হাজংয়ের গবেষণার মাঠ পরিদর্শন করেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। এ সময় তিনি সেন্টুর উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই দেশের কৃষকদের স্বার্থে তাঁর এই অবদান অনন্য নজির। সেন্টু হাজংয়ের সরকারি স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানোর আশ্বাসও দেন তিনি।

কৃষিতে স্থানীয় উদ্ভাবকদের যথাযথ মূল্যায়ন, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর বৈজ্ঞানিক যাচাই ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি উন্নয়নে এমন উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেন্টু হাজংয়ের দীর্ঘদিনের গবেষণার যথাযথ মূল্যায়ন এখন কৃষিসংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।