বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি কোম্পানীগঞ্জ শের তারিকুল শের তারিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০২১ ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেটের সর্বোত্তরের খনিজ সম্পদে ভরপুর উপজেলাটি হলো কোম্পানীগঞ্জ। ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী এখানের মোট জনসংখ্যা ১৭৪০২৯ জন। এতো সংখ্যক মানুষের উপজেলাটিতে সমস্যার অন্ততো নেই, দেখবালেরও কেহ নেই। একনজরে কোম্পানীগঞ্জের সমস্যাবলিঃ ১.শিক্ষার অনগ্রসরতা ২.বেকারত্ব ৩.বিদ্যুৎ বিভ্রাট ৪. ডাকাতি এবং চুরি ছিনতাই ৫.অনুন্নত এবং ব্যবহার অনুপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা ৬.কৃষির অনগ্রসরতা ও প্রযুক্তি জ্ঞাণ স্বল্পতা ৭.মাদকদ্রব্যের সহজ লভ্যতা ৮. ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের অভাব ৯. প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহন ১০. স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি ১১. প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণের অভাব ও অপব্যবহার ১২. সীমান্ত অপরাধে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা ১৩. কিশোরদের অপরাজনীতিরদিকে আকৃষ্ট করণ ১৪. নিরাপত্তাহীন শ্রমকর্মস্থল ১৫. পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও শরীর চর্চা কেন্দ্রের সংকট ১৬. নদী দখল ১৭. পরিবেশ দূষণ ১৮. হাওরবৃত্তিক সমস্যা ১৯. ধলাই ও অন্যান্য সেতু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ২০. ব্যবসায়িদের অসাধু কর্মকাণ্ড ২১. নিরবিচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্কের ঘাটতি ২২. দায়িত্বহীন জনপ্রতিনিধি ২৩.বস্তুনিষ্ঠ স্থানীয় সাংবাদিক সংকট ১. শিক্ষার অনগ্রসরতা; উন্নত,দক্ষ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিক্ষা একটি অন্যতম উপাদান। আমাদের দেশের শিক্ষার হার যেখানে শতকরা ৭৪.৭ ভাগ( তথ্যসুত্রঃ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, কালের কন্ঠ) কোম্পানীগঞ্জের সেখানে মাত্র ২৮.৮%। অথচ আমাদের প্রতিবেশি উপজেলা ছাতক ও গোয়াইনঘাটের শিক্ষার হার যথাক্রমে ৪০ ও ৩২.৭%। হবে নাইবা কেন? ছাতক আর গোয়াইনঘাটে যেখানে ১২২ ও ১১৭ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে সেখানে সরকারি ও বেসরকারি মিলেই আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো ৬৪ টি। তথ্য সুত্রঃ ১.Companigonj.Sylhet.Gov.bd ২.Gowainghat.Sylhet.Gov.bd ৩.Chhatak.Sunamganj.Gov.bd ২.বেকারত্ব ; সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বড় একটি সমস্যার নাম হলো বেকারত্ব। বেকারত্ব সমস্যার পেছনে মূল কারণ হলো আকস্মিকভাবে খনিজ পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া। তাছাড়া শিক্ষার আলোকহীনতা, পরিবর্তক কর্মসংস্থানের অভাব,শস্যের বহুমুখীকরণ ইত্যাদি উদ্যোগের অভাবের কারণে বেকারত্ব সমস্যা বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ীত্বে পরিনত হচ্ছে। ৩. বিদ্যুৎ বিভ্রাট ; বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখানকার একটি নিত্যনৈমিত্রিক ঘটনা। প্রতিদিন এখানে একাধিক বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, কখনো কখনো গ্রাহক অবগতি ব্যতীত সারাদিন বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে আধুনিক যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রিক সকল সমস্যা সাধারণ মানুষেকে পোহাতে হয়। ৪. ডাকাতি এবং চুরি ছিনতাই ; ডাকাতি এবং চুরি ছিনতাই কোম্পানীগঞ্জের সমস্যাগুলোর অন্যতম একটি। সিলেট- ভোলাগঞ্জ রোডের বর্ণি,খাটা খাল প্রভৃতি স্থানে ডাকাতির পাশাপাশি আশপাশের গ্রামে প্রতিনিয়ত গরু ও অন্যন্য মূল্যবান দ্রব্যাদি চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে থাকে। যা নিঃসন্দেহে এই এলাকার মানুষের জন্য কলঙ্কের(বিশেষ করে ডাকাতি) বিষয় । ৫. অনুন্নত ও ব্যবহার অনুপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা; কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় সব অঞ্চলে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান। আর যেটুকু আছে যেমনঃ ধলাই ব্রীজ – দয়ার বাজার – চড়ার বাজার, বিলাজুর – টাইয়া পাগলা- ফুটা মারা, দয়ার বাজার – রাধানগর, শান্তির বাজার – জীবনপুর, টলির লাইন – গাছঘর ইত্যাদি স্থানের রাস্তা কাঁচা হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই( বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তির আধিক্য তুলনামূলক বেশি থাকে)। এমনকি ভোলাগঞ্জ হাইওয়ে রোড পর্যন্ত অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য ভোগান্তি ও আর ঝুঁকি লেগেই থাকে। ৬. কৃষির অনগ্রসরতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব ; পুরো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জুড়েই কৃষিতে অগ্রসর হওয়ার পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। যেমনঃ শস্যের বহুমুখীকরণ এখানে প্রায় নেই। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন কৃষকরা প্রযুক্তি ব্যবহারের কতোটা সফল সেটি আর না বলাই শ্রেয়। ৭. মাদক দ্রব্যের সহজলভ্যতা ; ভৌগোলিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ ভারতীয় বর্ডারের সাথে সংযুক্ত থাকায় এখানে ভারতীয় মাদক দ্রব্যে অনেকটা সহজলভ্য। যার কারণে এখানের মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্ততাও কম সংখ্যক নয়। ফলাফল তরুণ প্রজন্মরের সাস্থ ঝুঁকি দিনদিন বাড়ছে এবং মাদকজনিত অন্যান্য সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৮. ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের অসঙ্গতি; কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ট্রাফিক আইন বলে একটা কিছু আছে বলে মনে হয় না।কারণ এখানে বছরের পর বছর রেজিষ্ট্রেশনবিহীন যান চলাচল (বিশেষ করে সিএনজি) এবং ভোলাগঞ্জ -সিলেট সড়কের পাড়ুয়া,বৌবাজার টুকের বাজার ও থানা সদরে রাস্তার দুপাশে সর্বদা অবৈধ পার্কিং লেগেই থাকে । এতে করে রাষ্ট্রের প্রচলিত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি এখানকার রাস্তা দিয়ে চলাচলকারি যাত্রীদের দূর্ঘটনা ঝুঁকি নিয়েই পথযাত্রা করে থাকেন। ৯. প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহন; প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখানে একপ্রকার অবাধে উৎকোচ গ্রহণ করার মতো অপরাধ সহজে করে যায়। এতে করে উপজেলার সাধারণ মানুষেরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ১০. স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি; কোম্পানীগঞ্জ খনিজ পাথুরে এলাকা হওয়ায় এখানে স্থানীয় চাঁদাবাজদেরও আদিপ্রত্তের শেষ নেই। এক্ষেত্রে ধলাই নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের চাঁদাবাজরা চাঁদাবাজি করে যায়, কখনো কখনো দুই পাড়ের স্থানীয় অসাধুরা সম্মিলিতভাবে চাঁদাবাজি করে থাকে। ১১.প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণের অভাব; কোম্পানীগঞ্জের প্রাকৃতিক সম্পদ বললেই পাথর, বালু ইত্যাদির দিকে প্রথমেই নজর আসে,অথচ এই সম্পত্তিগুলো সংরক্ষণের তেমন কোন পদক্ষেপ নেই। যার ফলে অন্যান্য সম্পত্তি যেমন ফসলি জমি ও বসতবিটার জমি খুঁড়ে পাথর আহরণের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর অনিশ্চিচয়তা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ১২. সীমান্ত অনিয়মে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা; সীমান্ত অনিয়মে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা একটি সমস্যার পাশাপাশি উদ্বিগ্নতার কারণও বটে। এখানে প্রায় সময় দায়িত্বশীল কর্মকর ১৩. কিশোরদের অপরাজনীতির দিকে আকৃষ্ট করণ; তুলনামূলক কম বয়সী অর্থাৎ কিশোরদেরকে একটি কুচক্রী মহল নানা রকমের লোভ লালসা ও ব্রেনওয়াশের মাধ্যমে অপরাজনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে শিক্ষার্থী কিশোরেরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি নানা প্রকার অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে, যা সত্যি গোটা কোম্পানীগঞ্জের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য লজ্জা এবং দেশ ও জাতির জন্য উদ্বেগজনক। ১৪. নিরাপত্তাহীন কর্মস্থল; কর্মস্থল বলতে অর্থনীতির ১ম পেশা অর্থাৎ পাথর শ্রমিক, কৃষক, মজুরদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার কথাই বলি। এখানে যখন পাথর শ্রমিকেরা খনি (কোয়ারি) থেকে পাথর উত্তোলন করে তখন তাদের নিরাপত্তার জন্য কোন রকম যেমনঃ মাথার হেলমেট, বোট এবং কোন প্রকার ইকোয়েভমেন্টপোষাক সরবরাহ করা হয় না। ফলস্বরূপ প্রতি বছর পাথর শ্রমিক আহতের পাশাপাশি নিহতও হয়ে থাকে। তাছাড়া হাওর এলাকায় চাষাবাদের সময় কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখোমুখি হলে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। ১৫. পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও শরীরচর্চা কেন্দ্রের অভাব; কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় হাতেগোনা কয়েকটি খেলার মাঠ থাকলেও সেটি কোনক্রমেই পর্যাপ্ত নয় এবং শরীরচর্চা কেন্দ্রের ব্যাপারে আমরা উদাসীন বলা চলে। ১৬. নদী দখল; কোম্পানীগঞ্জের সর্ববৃহৎ নদীটির নাম হলো ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরের বক্ষদেশ ছেদ করে আসা ধলাই। আর এই নদীর উপরে দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলাই সেতুর ঠিক পূর্বাংশে গড়ে উঠেছে কতিপয় পাথর মিল( স্টোন ক্রাশার) যেগুলো নদীর পাড় দখলের পাশাপাশি নদীর গতিপথেও বাধার সৃষ্টি করছে, এতে করে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল হলে কালাইরাগ দিয়ে নদীর গতিপথ চলে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। লেখক:- মোঃ ফয়জুর রহমান শিক্ষার্থী শাবিপ্রবি, সিলেট। ইমেইলঃfoyjurrahman3665@gmail.com SHARES গণমাধ্যম বিষয়: