লকডাউন কোম্পানীগঞ্জ – কর্মহীন অর্ধলক্ষ ভুভুক্ষা পরিবারের পাশে নেই জনপ্রতিনিধিরা

Desk Desk

News

প্রকাশিত: ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০২০

 

ষ্টাফ রিপোর্টারঃ-বিশ্বআতঙ্ক করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আক্রমণ করাার কারনে সেখানে উত্তর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জবাসীর প্রধান ক্রাইসিস এখন দুইটি।

প্রথমটি অর্ধ লক্ষ কর্মসংস্থানহারা মানুষ ।
অন্যদিকে দ্বিতীয়টি মরার উপর খারার ঘা হয়ে মৃত্যুর বার্তা বয়ে বেরানো বিশ্ব করোনাভাইরাস রোধে উপজেলায়”লকডাউন” চলছে ।

করোনা থেকে বেচে থাকতে চাইলে অবশ্যই সবাইকে লকডাউন মেনে ঘরে বসে থাকতে হবে,নচেৎ মানবজাতীর বির্পযয় অনিবার্য।

অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জের মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে হাল আমলের মত দিশেহারা হয়নি কোনদিন।যদি কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা থাকতো তবে লকডাউনে এতো কষ্ট করতে হতো না।

বর্তমানে অর্থনৈতিক দূর্দশাগ্রস্থ কোম্পানীগঞ্জ লকডাউন দেওয়ার অনেক আগেই কর্মলকড হয়ে ঘরে বসে আছে।

২০/২৫ বছর আগে কোম্পানীগঞ্জের ৯০ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল বারকি অথবা কালেকশন ব্যাবসা। তবে সবাই এই পেশার পাশাপাশি কৃষিতেও মনযোগ ছিল।কোম্পানীগঞ্জে আশরাফ শ্রেণীর মানুষ ছিল হাতে গুনা দু চারটি পরিবার। আর বাদ বাকী সবাই শ্রমজীবী ও মধ্যপন্থি শ্রেণীর মানুষ অথবা আতরাফ শ্রেণীর।

এখন সরাসরি বারকির যুগ না থাকলেও এই বারকি/কমিশনশ্রেণী থেকেই ধীরে ধীরে এক শ্রেণীর পুজিপতির আবির্ভাব ঘটেছে।আজকের পাথর কোয়ারী পেশা এবং চুনাপাথর আমদানিকারক ব্যাবসায়ীদের এই শ্রেণীটাই তখনকার সময়ের বারকি/কমিশন শ্রেণীদের একটি অংশ।সেই ২০/২৫ বছর আগের বারকিতে সভ্যতার ছোয়া লেগে লিষ্টার বারকি নামক নতুন করে রুপান্তরিত হয়েছে।আর এই পেশায় নিয়োজিত আছে ২০/২৫ হাজার শ্রমিক।

রাজনীতির মাঠে যারা বীরদর্পে সামনের চেয়ার দখলে ব্যাস্ত রয়েছেন বেশীর ভাগ সেই বারকি/কমিশন শ্রেণীর ব্যাক্তিরাই এগিয়ে আছে ।আশরাফ শ্রেণীর ব্যাক্তিরা রাজনীতির মাঠে কোন দিন জয় দেখেনি,তবে দু একজন ছাড়া।আর এলসি/ কোয়ারীতে কর্মসংস্থান নিয়ে বেচে আছে নিত্য লেবার শ্রেনীর ১৫/২০ হাজার হতদরিদ্র পরিবার।

কোম্পানীগঞ্জের রাজনিতির মাঠে যেহেতু সেই ২০/২৫ বছর আগের শ্রমকেন্দ্রীক শ্রেণীরাই প্রতিনিধিত্ব করছে সেহেতু বর্তমান এই বিশ্ববির্পযয় লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্থ ভুভুক্ষা কর্মহীন ৪০/৫০ হাজার শ্রমিকের পাশে দাড়ানোর কথা ছিল এই জনপ্রতিপিতা/অভিভাবকরা। তারা কিন্তু নিজ তহবিল থেকে এগিয়ে এসে বড় অংকের কোন অনুদান দিয়ে সমাজের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাড়ায়নি এখনো কেউ।উপর তলার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে নিচু তলার জনপ্রতিনিধিরাও হাত বাড়ায়নি এখনো।

বরং কি করছে তারা?

তারা (জনপ্রতিনিধিরা) সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা ফেসবুকে প্রচারনার নাম করে নিজেদের তোলপার করে রাখছে।

বিনিময়ে লাভের লাভ এটুকুই হয়েছে, তারা নিজেদের পরবর্তি নির্বাচনের জন্যে প্রচারণার চাপটি কমিয়ে রাখছে,জনগন এর চেয়ে বেশী কিছু ভাবছেনা আমি মনে করি।নিজেকে প্রচারণামুখর করে রাখতে বাঙ্গালীরা ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। আর যদি কোন উপলক্ষ থাকে তবেতো কোন কথাই নেই।বর্তমান বিশ্ববির্পযয় করোনাভাইরাসের কোন প্রতিষেধক তৈরী হয়নি সেহেতু প্রতিরোধ এবং সচেতন ব্যাবস্থায় হচ্ছে প্রধান দাওয়াই। অনেকেই ভার্চুয়াল জগতে যে যেভাবে পারছে নিজেকে প্রচারনায় এগিয়ে রাখছে।অনেকেই ভিন্ন মতালম্বি,তারা চায় না নিজেদের নাম প্রচারে আসুক।ফেসবুক খুললেই দেখা যায় করোনা থেকে সাবধানতার জন্যে ফেস্টুন বিতরন করছে অনেক যুব সংগঠন ।কিন্তু ফেস্টুন বিতরন করছে ভাল কথা। বাধসাদছে অন্যজায়গায়, যেই ফেস্টুনে নির্দেশনা লিখা আছে জনসমাগম পরিহার করা উচিৎ কিন্তু বিতরণকারীরা নিজেরাই ছোট খাট নির্বাচনী প্রচারনার মত জনসমাগম সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করছে।নিজেরা যেখানে জনসমাগম সৃষ্টি করছে সেখানে জনগনকে কি করে সচেতন করবে তা বাঙ্গালী হিসেবে আমার জানা নেই।করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশে লকডাউন চলাকালীন সময়ে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলোর জন্যে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন বেচে থাকার প্রয়োজনীয় খাদ্য।সবাই ফ্রি ফ্রি সচেতনতায় এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু অর্থখরচ করে কারোঘরে খাদ্যের জোগান দিতে এগিয়ে আসতে অনিহা।

ফিরে আসি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনে বিপর্যস্থ কর্মহীন মানুষের পাশে না দারানো জনপ্রতিপিতা/অভিভাবকদের অনিহাসৃষ্টির কারন খুজতে।

কোম্পানীগঞ্জের বেশীরভাগ মানুষ শ্রমজীবী বা খেটেখাওয়া শ্রেণীর । এই সব শ্রমজীবিরাই নির্বাচনকালীন সময়ে জয় পরাজয়ের কারন হয়ে দারায়।তাইতো সব প্রার্থীরাই যে যেভাবে পারছে শ্রমিকবান্ধব হওয়ার চেষ্টা করে। যে যত বড় অভিনেতা সেই তত সাফল্যের মুখ দেখে ।এই নব্য এলিট শ্রেণীকে অভিনেতা বলছি এই কারনে-নির্বাচনে ভোটারদের কাছে টানতে প্রার্থীরা যে ওয়াদা দিয়ে আসে সেই ওয়াদা কি কখনো পূরন করেছে ?

বিশ্ববির্পযয় করোনা রুখতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা/উপজেলায় নকডাউন চলছে।দেশে প্রায় ৭ কোটি দরিদ্র মানুষ। লকড ডাউনে অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছে।দেশে যদি ৭ কোটি হতদরিদ্র মানুষ থেকে থাকে তবে সেই তুলনায় কোম্পানীগঞ্জে কি কোন অসহায় হতদরিদ্র পরিবার নেই?

দেশের আমলা/মন্ত্রীরা যতই না মেনে নিক কোম্পানীগঞ্জে দরিদ্র নেই, আমি জোর কলমে বার বার লিখবো এই উপজেলায় ৪০/৫০ হাজার হতদরিদ্র পরিবার আছে যাদের ঘরে ৩/৪ জনের সদস্য আছে যারা খেয়ে না খেয়ে কোনরকমে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে।

এই হতদরিদ্র পরিবার গুলো অনেক আগেই লকডাউন হয়ে ঘরে বসে আছে।এই লকডাউন হওয়ার একমাত্র কারন অত্র উপজেলার একমাত্র কর্মসংস্থান কোয়ারীগুলো বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষ শ্রমিক পরিবার।এর মধ্যে এখন চুনাপাথর আমদানীও বন্ধ হয়ে রয়েছে।এতে করে এই পেশাতে ২/৩ হাজার শ্রমিক কাজ করতো এখন তারাও বেকার।তবে কোম্পানীগঞ্জে শ্রমিকদের জন্যে আর কোন শ্রমের দরজা খোলা রইল না।

এই অর্ধ লক্ষ শ্রমিক পরিবারকে ব্যাবহার করে নব্যসৃষ্ট এলিট শ্রেণীভূক্ত পুজিপতিরা কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে।তাদের এই টাকার পাহাড় থেকে ধুলিকণা সার্দশ্য অর্থও সরকারের রাজস্বখাতে জমা পড়েনি।বালতি ভর্তি দুধে যদি এক ফোটা গো-চনা পরে নষ্ট হয়ে যায় তবে নব্যসৃষ্ট এই সব টাকামজুদারদের টাকাগুলো কালো অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করা উচিৎ। জাতির এই দূর্ভিক্ষের দিনে যদি তাদের এই রক্ষিত টাকা ব্যায় না করে থাকে তবে তাদের নামের আগে গরিবের বন্ধু ও জনসেবক লাগানোর আগে গরীবের পা ধরে অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন মনে করি।কারন গরিব ও শ্রমজীবীরাই এই স্বঘোষিত এলিট শ্রেণীদের জন্মদাতা।

এক সপ্তাহ আগেও ফেসবুকে দেখা যেতো গরীব বাচাতে চাইলে কোয়ারী খুলে দাও।কোথায় সেই ফেসবুক নেতারা,এই দুই দিনের লকডাউনে কোম্পানীগঞ্জের কোন দরিদ্রের ঘরেতো আপনাদের পা পড়েনি?বুজতে বাকি নেই ভোটের মাঠেও এই প্রয়োজন গরীব,টাকার পাহাড় গড়তেও প্রয়োজন গরীব।

দেশে দূর্ভিক্ষ বা কোন প্রাকৃতিক বির্পযয় শুরু হলে কোন ধনীর দুলালকে মরতে দেখেনি ,মরেছে শুধু এই গরীব শ্রেণী।একটা সময় মিছিলের সামনে থেকে কেউ স্লোগান তুলে গরীবকে ধনীদের কাতার থেকে বিদেয় করে দিবে – “গরীবের চামড়া তুলে নেবো আমরা” হয়তো এই স্লোগান তুলে সমাজ থেকে ধনী গরীব আলাদা হয়ে যাবে। সেই দিনও বেশী দুরে নয়,যে দিন গরীবদের জন্যে আলাদা জগত সৃষ্টি হবে।আর তারা হবে অন্যজগতের পয়সাওয়ালাদের চুক্ষুশুল। হয়তো গরীবের জন্যে আলাদা আলাদা জন্মনিবন্ধন ও আইডিকার্ড তৈরী করে চিহ্নিত করে তাদেরকে নব্যসৃষ্ট স্বঘোষিত এলিট শ্রেণীরা সমাজ থেকে আলাদা করে রাখবে।

শহরের উচু দালানে বসে যারা দুধে কাটা খুজেন তাদের বলছি এই কোম্পানীগঞ্জের শ্রমিকরা বর্তামানে বালুচরে ভাত খুজেন।এই শ্রমিকরা বালুকেই ভাত এবং ভাতকে বালু মনে করেন।আপনারা (এলিট শ্রেণী) যেখানে ব্যাংকের উদ্বৃত হিসাব করেন সেখানে শ্রমিকরা দুপুরের খাবার খাওয়া শেষে রাতের খাবার কোথায় থেকে আসবে সেই হিসাব করে।

বিশ্ব আতংক করোনাভাইরাসের কারনে যেমন দেশের অর্থনীতির চাকা স্তব্ধ গেছে সেখানে কোম্পানীগঞ্জের অর্থনীতি অনেক আগেই দেউলিয়া হয়ে গেছে। লকডাউন কোম্পানীগঞ্জে শ্রমিকরা সচেতন হতে চায় ঠিক তবে তার আগে বেচে থাকার জন্যে খাদ্য পেতে চায়।এখনই সময় শ্রমিকদের মুখে খাদ্য তুলে দিন।নইলে কোম্পানীগঞ্জের মানুষ করোনায় মড়ার আগেই খুধায় মারা পড়বে।

তারিকুল ইসলাম
সাংবাদিক,কলামিস্ট।

(সি/স-২৭মার্চ-তা/ই)