বিলীন হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধের সাব সেক্টর ও ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে:প্রকাশ্যে পাথর লুট

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১

তারিকুল ইসলাম:-দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত রুজ্জুপথ ভোলাগঞ্জ রোপওয়েতে প্রকাশ্যেই চলছে লুটপাট।বিজিবি ও রোপওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরএনবি’র কিছু ঘুসখোর সদস্যকে ম্যানেজ করে স্থাপনা ভেঙ্গে চলছে এই লুটপাট। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ধলাই নদীর মাঝখানে দাড়িয়ে থাকা দ্বীপরুপী রোপওয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নিচে হাজার কোটি টাকার পাথরের উপর লুলুপ নজর পড়েছে কতিপয় পাথর খেকুর।দীর্ঘদিন যাবত সেই পাথর খেকুরা রোপওয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নিচে গর্ত করে পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে।পাথর উত্তোলনের কাজটি প্রকাশ্যেই হচ্ছে যার কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ সিলকো সংবাদের হাতে রয়েছে।সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে,রোপওয়ের মূল স্থাপনার নিচে কয়েকজন শ্রমিক শাবল দিয়ে গর্ত করে যাচ্ছে।কয়েকজন শ্রমিক মাথায় পাথর বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে।পাশেই ধলাই নদীতে রাখা বারকি নৌকায় সেই পাথর বোঝাই হচ্ছে।প্রতিদিন ৫০/৬০ বারকি নৌকা পাথর লুট হচ্ছে।প্রতি বারকি পাথর নিতে বিজিবি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আরএনবিকে দিতে হয় ৫০০ ও ১০০০ টাকা। প্রতিটি বারকি নৌকায় বোঝাইকৃত পাথর বিক্রি হয় ৫/৬ হাজার টাকা।এভাবে ৫০/৬০ বারকি নৌকা পাথর বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩/৪ লক্ষ টাকা।প্রতিদিন বিজিবি ও আরএনবিকে দিতে হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা চাঁদা।

পাথর লুট করার সময় একজন পাথর শ্রমিক বলেন,বিজিবিকে দিতে হয় ৫ শত ও আরএনবিকে দিতে হয় ১ হাজার।

যেহেতু পাথর উত্তোলনের স্থানটি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বে সেই জন্যে তাদেরকে দিতে হয় ১ হাজার টাকা। আর রোপওয়ের পাশেই কালাইরাগ সীমান্তে বিজিবির টহল টিমের মুখ বন্ধ করতে তাদেরকেও দিতে হয়  ৫ শত টাকা।এই দুই পক্ষের মাঝখানে রয়েছে তৃতীয় একটি চাঁদাবাজ চক্র।তাদেরকে দিতে হয় নৌকা প্রতি ১ হাজার।দয়ার বাজারের আশে পাশে সেই চাঁদাবাজ চক্রের রয়েছে শক্তিশালী সংঘবদ্ধ গ্রুপ।দিনের অধিকাংশ সময় সেই গ্রুপের সদস্যরা বিজিবি টহল ক্যাম্প ও আরএনবির সাথে সময় কাটায়।পর্যটকদের আনাগোনা কম হলেই সুযোগ বুঝে সেই ঘুসখোর নিরাপত্তা রক্ষী ও বিজিবি সদস্যদের ম্যানেজ করে চালায় পাথর লুটের তান্ডব।

রেলওয়ের রজ্জুপথ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাথর পরিবহনে স্থল কিংবা জলযানের বিকল্প হিসেবে ভোলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের ছাতকে রজ্জুপথ স্থাপন হয় ১৯৬৪ সালে। এ রজ্জুপথে ১১৯টি খুঁটি রয়েছে। ভোলাগঞ্জ রজ্জুপথের লোডিং স্টেশন (বাংকার) ও ছাতক খালাস স্টেশন। বাংকারের ৩৫৯ একর জমি, অবকাঠামোসহ রেলের স্থাপনা, যন্ত্রপাতি দেখভাল করতে ২০০০ সাল থেকে দায়িত্বে ছিল আনসার বাহিনী। কিন্তু তখন বেআইনিভাবে পাথর উত্তোলন ও বিক্রির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে।
২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আনসার প্রত্যাহার করে দায়িত্ব নেয় আরএনবি। একজন প্রধান পরিদর্শক ও দুজন উপপরিদর্শকের নেতৃত্বে ৪৮ সদস্যের আরএনবি দল সার্বক্ষণিক ভোলাগঞ্জে রজ্জুপথের বাংকারে অবস্থান করে পাহারা দেওয়া কথা থাকলে মাত্র ২০ জন আরএনবি সদস্য পাহাড়ায় রয়েছে। এর মধ্যেও চলছে লুটপাট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রজ্জুপথ বাংকারের প্রবেশমুখের খুঁটিগুলো বেঁকে গেছে। ১২ থেকে ৯ নম্বর খুঁটি এবং বাংকারের পশ্চিম ও পূর্বদিকে প্রায় ১০/১১ একর জায়গায় যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করে লুট হয়েছে পাথর। লোডিং স্টেশনের স্থানে কোনো গাছপালা নেই। প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীর গর্ত করে সেগুলো থেকে পাথর উত্তোলন করায় রেললাইনের আদলে রজ্জুপথে পাথর বাক্স পরিবহন পথের একাংশ উপড়ে পড়েছে।

পাথর ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাব অনুযায়ী, আরএনবির অধীনে থাকা অবস্থায় গত নয় বছরে রজ্জুপথের বাংকার থেকে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। পূর্বে আরএনবি তাঁদের মাসিক প্রতিবেদনগুলোতে এ পরিস্থিতিকে ‘রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তৎপরতা’ উল্লেখ করলেও পাথর লুটপাটকারী কারও নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি।

লুটেরাদের কবলে পড়ে রোপওয়ের সোনালী যৌবন যেনো সময় থাকতেই ফুরিয়ে গেছে।রেলওয়ে প্রশাসনের উর্ধতন কতৃপক্ষের দায়সারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরকারী এই রুজ্জুপথ ধংসের একমাত্র কারন।উর্ধতন কতৃপক্ষের পরিকল্পনায় অনেকটা পাথরলুটের চিত্র ফুটে উঠে।নিরাপত্তার দিতে আসা আরএনবি সদস্যরা মাত্র ১৫ দিনের জন্যে আসে।এই ১৫ দিনে যা পারে লুটে পুটে নেয়।আবারো নতুন কোনো টিম আসে।তারাও সেই একই কাজে ব্যাস্ত থাকে।

তাদের না আছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা,না আছে বর্ষায় নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো নৌকা আর তারা দীর্ঘদিনের সেই সমস্যার দোহাই দিয়ে স্থানীয় পাথর খেকুদের সাথে হাত মিলিয়ে পাথর লুট হতে সহায়তা দিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে রোপওয়ের প্রায় ৯০/৯৫ ভাগ সম্পত্তি পাথর খেকুদের সাথে হাত মিলিয়ে ধংস করে ফেলেছে নিরাপত্তা রক্ষীরা।এই নিয়ে ইলেকট্রনিকস, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়াতে বার বার সংবাদ প্রচার করার পড়েও কোনো কাজ হয়নি।উলটো পাথর লুটেরাদের তান্ডব যেনো বেরেই চলছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে এই রোপওয়ের রয়েছে গৌরবান্বিত ইতিহাস।মুক্তিযুদ্ধে ৫ নং সেক্টরের সাব সেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল এই ভোলাগঞ্জ রোপওয়েতে।শত্রুর বিরুদ্ধে সকল পরিকল্পনা এই ভোলাগঞ্জ  সাব সেক্টর থেকেই নেওয়া হতো। কালের স্বাক্ষী এই রোপওয়েকে নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চিঠি চালাচালিতেই যেনো তার যৌবন ফুরিয়ে গেলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান,মুক্তিযুদ্ধের সময় এই রোপওয়ে আমাদের আশ্রয় দিয়েছে,নিরাপত্তা দিয়েছে।কিন্তু আজ আমার চোখের সামনেই সব ধংসে হচ্ছে।রোপওয়ের নিরাপত্তা দিতে আসা নিরাপত্তা রক্ষীরাই যেন এর ভক্ষক।সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত এই রোপওয়েকে অতি শিগ্র সংরক্ষন করা হোক।

(সি/স-০১ মার্চ-তা/ই)