অবহেলায় মোড়ানো “শিলেরভাঙ্গা রাস্তা”

প্রকাশিত: ৭:৪৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২১

তারিকুল ইসলাম:-পঞ্চাশের দশকে গড়া উঠা শিলেরভাঙ্গা গ্রামটি আজও উন্নয়ন বঞ্চিত। ছয় যুগেরও পুরাতন এই গ্রামটি যেন অবহেলায় মোড়ানো এক মৃত লাশ। দেশ ডিজিটাল হলেও শিলেরভাঙ্গা যেন ধীরে-ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সারাদেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসলেও শিলেরভাঙ্গা যেন সেই আদিম যুগেই রয়ে গেলো। এখানে আধুনিকতার কোনো চিত্রই খুঁজে পাওয়া যায় না। গত শতাব্দী পঞ্চাশের দশকে এই গ্রামটি গড়ে উঠার পেছনের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধশালী। তৎকালীন পশ্চিম বাংলার রেলপথ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উন্নত পাথরের যোগান আসতো এই ভোলাগঞ্জ থেকেই। ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর নেওয়ার জন্যে সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যে তৎকালীন বৃটিশ-ভারত সরকার নির্মাণ করেন ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে (রুজ্জুপথ)। অল্প খরচে জলপথে পাথর নেওয়ার জন্যে ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে থেকে ভাঙ্গা (শিলেরভাঙ্গা) পর্যন্ত নির্মাণ করা হয় প্রায় ছয় কিলোমিটারের ছোট্ট রেলপথ। স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে ভাঙ্গা পাথর ছোট ছোট ওয়াগনে করে এই রেলপথ ধরে ভাঙ্গার পার (শিলেরভাঙ্গা) এসে মজুদ হতো। বর্ষা আগমনে সেই মজুদকৃত পাথর বড় বড় কার্গোর সাহায্যে চলে যেতো দেশের বিভিন্ন রেল জংশনে। ভোলাগঞ্জের এই উন্নত ভাঙ্গা পাথর দিয়েই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশের নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণ হতে থাকে।

পাথর মজুদের এই ভাঙ্গা স্থানকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে উঠে। ভোলাগঞ্জের পাথর উন্নত হওয়ায় রন্ধন শিল্পে ব্যবহৃত পাথরের শীল-পাটা ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পাথরের শীল-পাটা এই ভাঙ্গার পার থেকেই ক্রয় করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্যে নিয়ে যেতো। মূলত রোপওয়ের পাথর শ্রমিকরাই অবসর সময়ে এই শীল-পাটা তৈরী করতো। বর্ষা আসলে নৌকাযোগে সেই শীল পাটা দেশের বিভিন্ন ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করত সেই শ্রমিকরাই। ধারনা করা যাচ্ছে শীল-পাটা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই ভাঙ্গার পারে বসতি গড়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে “ভাঙ্গা” থেকে এই স্থানটি শিলেরভাঙ্গা নামেই সমাদৃত হতে থাকে। দেশ বিভাগের পর পরবর্তিতে রোপওয়ের মালিকানা বৃটিশ ভারত থেকে নব্যসৃষ্ট পাকিস্তানের হাতে চলে আসে। এরপর রক্তক্ষ্রয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে এই রোপওয়ের মালিকানা বাংলাদেশের হাতে আসে। সেই বৃটিশ ভারত থেকে শুরু পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রেলপথে উন্নয়ন ভাগ্য রচনা হয়েছে এই শিলেরভাঙ্গা থেকেই। কিন্তু শিলেরভাঙ্গার ভাগ্য আর পরিবর্তন হয়নি। অন্যের ঘরে প্রদিপ জ¦ালানো শিলেরভাঙ্গা আজও অন্ধকারে পরে আছে। মধ্যযুগীয় রূপে শিলেরভাঙ্গার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকায়নি। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই গ্রামটি ছাতক উপজেলা সদর থেকে ১৫/১৬ কিলোমিটার হলেও উপজেলা বিভক্তির পর বর্তমানে এ গ্রামটি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে মাত্র কয়েক শত ফুট দূরত্বে থেকেও সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পশ্চিমমূখি ও উত্তরমূখি দুইটি রাস্তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মহাসড়ক ও টুকের বাজারের সাথে সংযুক্ত করেছে এই শিলেরভাঙ্গা গ্রামকে। দুইটি রাস্তায়ই ভাঙ্গা ও জরাজীর্ণ। রাস্তায় বড় বড় গর্ত থাকায় বয়োবৃদ্ধরা যেন ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। অসুস্থ রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে পায়ে হেটে যেতেও অনেক বেগ পেতে হয়। গর্ভবতী মহিলাদের মাসিক চেকআপ করাতে ঝুকি নিয়েই উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে যাতায়াত করতে হয়। বিদ্যালয় ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্টানে যাতায়াতে অনেক বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। গ্রামটি ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের অন্তভূক্ত। বর্তমান ওয়ার্ড মেম্বার কামরুজ্জামানের বাড়ি এই শিলেরভাঙ্গা গ্রামেই। অত্র ওয়ার্ডের মেম্বার এই গ্রামের বাসিন্দা হলেও কি কারনে গ্রামের উন্নয়ন থেমে আছে তা এলাকাবাসীর অজানাই রয়ে গলে। গ্রামে নেই কোনো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কয়েক শত শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে একটি মাত্র কওমী মাদ্রাসা। গ্রামের রাস্তাঘাট খারাপ হওয়ার কারনে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোনোর আগেই ঝড়ে পড়ে। এই গ্রামের ভূমি অনেক উর্বর। এখানে ফলনও ভালো হয়। রাস্থাঘাট খারাপ হওয়ায় সবজি ও তরিতরকারী বাজারে বিক্রয় করতে নিয়ে যেতে বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় অনেক কৃষক পেশা পরিবর্তন করেছে।

গ্রামটিকে দুইটি রাস্তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মহাসড়ক ও টুকের বাজারের সাথে সংযুক্ত করেছে। শিলের ভাঙ্গা-টুকের বাজার এবং শিলেরভাঙ্গা- বঙ্গবন্ধু মহাসড়কে সংযোগ রাস্তার বেহাল অবস্থা সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার উপরাংশে বড় বড় গর্তের আকারে ছোট ছোট পুকুর রূপ ধারন করেছে। প্রায় দুই কিরোমিটার রাস্তায় কাদা ও ময়লা পানি বন্দি হয়ে আছে। মানুষ পায়ে হেটে যাওয়ার উপায় নেই। অথচ কয়েক বছর পূর্বেও এই দুইটি কাচা রাস্তা দিয়ে অনায়াসে সিএনজি, প্রাইভেটকার, এম্বোলেন্স সহ সব ধরনের যান চলাচল করতে পারতো। বিগত কয়েক বছর যাবত অতিরিক্ত পাথর বোঝাই ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচলের কারনে এই রাস্তা দুটিতে বড় বড় গর্ত তৈরী হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যে এই গ্রামটিকে অবহেলা করছে তার প্রমাণ মিলে শিলেরভাঙ্গা-টুকের বাজার রাস্তার গ্রামীণ ব্যাংকের সামনের বিশাল আকৃতির ১৫/২০ ফুট চৌড়া বিশাল ভাঙ্গা চিত্র দেখে। গত বছরের বন্যায় গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে বিশালাকৃতির ভাঙ্গনের ফলে শিলেরভাঙ্গা-টুকের বাজার রাস্তায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। এক বছর পার হলেও সেই ভাঙ্গা অংশটি এখনো মেরামত করা হয়নি। সম্প্রতি শিলেরভাঙ্গা-টুকের বাজার রাস্তার শিলেরভাঙ্গা অংশে ৬ শত মিটার দৈর্ঘ ও ৩ মিটার প্রস্তের ১৪ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই পাকাকরণ রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। জিলানী এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ৭৯ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা ব্যায়ে রাস্তার নির্মাণ কাজ চলছে। গ্রামের দুইটি রাস্তার আয়তন প্রায় দুই কিলোমিটার হলেও মাত্র অর্ধ কিলোমিটার রাস্তা পাকা হচ্ছে। রাস্তার বাকী অংশ ভাঙ্গা, বড় বড় গর্ত থাকায় চরম দূর্ভোগ নিয়েই চলাচল করছে জনসাধারণ।
অবহেলায় মোড়ানো শিলেরভাঙ্গা গ্রামের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে স্থানীয় বাসিন্দা কিবরিয়া মিয়া বলেন, উপজেলা সদরের কাছেই আমাদের গ্রামটির অবস্থান। গ্রামের রাস্তা দিয়ে কোন ভাবেই চলাচল করা যায় না। রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে কাঁদার কারনে কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। আবার শুনেছি কিছু দিনের মধ্যে নাকি স্কুল কলেজ খুলে দেওয়া হবে। রাস্তার এই অবস্থা থাকলে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে কষ্ট হবে। অনেক শিক্ষার্থী রাস্তা ভাঙ্গার অযুহাত দেখিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে চাইবে না। গ্রামে প্রবেশের দুইটি রাস্তার ভাঙ্গা ও গর্ত গুলোতে মাটি ভরাট করে চলাচল উপযোগী করে দেওয়ার জন্যে স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছে অনুরোধ করেন তিনি।আবু আল হেলাল নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাট গুলো নাকি দ্রুত মেরামত হয় ? আমাদের চলাচলের রাস্তাটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই বছর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাস্তা মেরামতের কাজতো হচ্ছে না।
রাস্তা মেরামতের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন আচার্য প্রতিবেদক-কে বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ভাঙ্গার রাস্তার পাকাকরণ কাজ ও মেরামতের জন্যে একটি তালিকা করা হয়েছে। খুব শিগ্রই রাস্তাগুলোর মেরামত শুরু হবে। শিলেরভাঙ্গা রাস্তার বেহাল অবস্থা শুনেছি। খুব শীগ্রই রাস্তাটির ভাঙ্গা অংশে মাটি ভরাট করে মেরামত কাজ করা হবে।

(সি/স-০৮ সেপ্টেম্বর-তা/ই)