নেপালে বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০৬৬ জন শের তারিকুল শের তারিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল ও তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৬৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে এক হাজার ৫০ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজার ৪৬২ জনের বেশি। এএফপি জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকলেও ধ্বংসস্তূপ ও কাদায় আটকে থাকা বহু মানুষের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। গত বুধবার উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি, পাথর ও কাদার স্রোত নেমে আসে। এতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ হয়ে যায়। পুরো জনপদ ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিন হাজার ৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে ১৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটি টানেল। সেখানে প্রায় ১০০ কর্মী আটকা থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে খননযন্ত্র, ড্রিল ও বিস্ফোরক ব্যবহার করছেন। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা টানেলগুলো থেকে জীবিত কাউকে উদ্ধার করতে পারেননি, বরং কয়েকটি জায়গা থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, একটি নতুন পথ তৈরি করতে গিয়ে সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি ঢুকে পড়ায় উদ্ধারকারীদের বিকল্প পথে খনন শুরু করতে হয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল অবশ্য নিখোঁজদের কেউ কেউ এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অলৌকিক ঘটনাও ঘটে। এই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিতে চাই না।’ রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মানুষ ভিড় করছেন। অনেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে খোঁজ করছেন। আবার দীর্ঘ সময়েও স্বজনের সন্ধান না পাওয়ায় কেউ কেউ হিন্দু রীতি অনুযায়ী প্রতীকী শেষকৃত্যও করছেন। নুওয়াকোট জেলায় একটি বাড়ির ভেতর থেকে ২৪ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারে ড্রোন ব্যবহার করছে পুলিশ। বন্যায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষ প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুঁজছেন এবং প্লাস্টিকের চাদর টানিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করছেন। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। নেপালে মর্গগুলোতে মরদেহ রাখার জায়গা সংকট দেখা দেওয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর অনেক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফন করা শুরু হয়েছে। এদিকে নেপাল থেকে ভেসে যাওয়া অন্তত ১৭ জনের মরদেহ ভারতের নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের তালিকায় ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক রয়েছেন। নেপালে ৫৮৩ জন এবং চীনে ২৬১ জন বিদেশি নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে হিমালয়ে ট্রেকিং করতে যাওয়া পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, তিব্বতে দুই হাজারের বেশি মানুষ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। তারা নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি সড়ক মেরামত, যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃস্থাপন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করার কাজ করছেন। এই ভয়াবহ দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন নেপালের কর্মকর্তারা। হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে দ্রুত গলছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলের হিমবাহ প্রায় ২৪ কোটি মানুষের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও প্রায় ১৬৫ কোটি মানুষ। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, এই দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের ঝুঁকির একটি ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে দেখা উচিত। তার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাকে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নেপাল সরকার জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর পুনর্গঠন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। উদ্ধার অভিযান চললেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণে দেশটির সামনে এখন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। Download News PhotoCard SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: