স্ত্রী সন্তানকে খুন করতে পারে হিফজুর নিজেই

Desk Desk

News

প্রকাশিত: ৬:২২ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২১

কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবে এই কথাটাই সত্য। যা কল্পনা করার নয় তা যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন যে কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ঘটতে পারে অনাকাংক্ষিধত দুর্ঘটনা। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও গড়াতে পারে।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিন্নাকান্দি গ্রামের দক্ষিণপাড়ার লোমহর্ষক নৃশংস হত্যাকাণ্ড এলাকার মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। কি করে কি হয়েছে কেউ আঁচ করতে পারছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভাবিয়ে তুলেছিল বিষয়টি। তাদের চৌকস নেতৃত্ব আর তীক্ষèদৃষ্টির জ্ঞান-গরিমায় দুটি বিষয়কে পয়েন্ট করে ট্রিপল হত্যাকাণ্ডর রহস্যের জাল ধীরে ধীরে ভেদ করছে পুলিশ। সময় যত গড়াচ্ছে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে নৃশংস ট্রিপল মার্ডারের অভিযোগের তীর গৃহকর্তা ঘাতক হিফজুরের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
দুই সন্তানসহ আলিমাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তার পাঁচ বছর বয়সী আরেক ছেলে আফসান। ঘটনার রাতে সে পার্শ্ববর্তী এলাকায় নানাবাড়িতে ছিল। মা ও ভাই-বোন হত্যার খবর এখনো সে জানে না।
আফসানের নানা (আলিমার বাবা) আইয়ুব আলী বলেন, ‘আফসান বর্তমানে আমাদের বাড়িতে আছে। তাকে মা ও ভাই-বোনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। সে ওই বাড়িতে থাকলে হয়তো তাকেও হত্যা করা হতো। তিন খুনে হিফজুরকে ঘিরেই সন্দেহ। স্ত্রী ও দুই সন্তানের ‘ঘাতক’ হিফজুরই-এমন ধারণা পুলিশের। তিনজনেরই ছিল গলাকাটা। শরীরে কোপানোর চিহ্ন। কিন্তু শিশুদের পিতা হিফজুরের শুধু পায়ে আঘাত ছিল। সেই আঘাতও ততটা গুরুতর নয়। ঘটনার পর থেকে হিফজুর নিজেও অজ্ঞান হওয়ার ভান করছিল। এরই মধ্যে পুলিশ তাকে হাসপাতালের বেডে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা চালায়। কিন্তু পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও হিফজুরের কথাবার্তা ছিল অগোছালো অস্বাভাবিক।
‘মানুষ কাটিনি, মাছ কাটছি’- এ ধরনের কথাবার্তা আওড়াচ্ছিলেন তিনি। সিলেটের গোয়াইনঘাটের বিন্নাকান্দি গ্রামের বসতঘর থেকে গত বুধবার সকালে হিফজুরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন স্থানীয়রা। একই সময় তার ঘরের খাটের উপর স্ত্রী আলেয়া, ছেলে মিজান ও মেয়ে তাহসিনার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কী কারণে এই তিন খুন- এ নিয়ে লাশ উদ্ধারের পর থেকেই তদন্তে নামে পুলিশ।
সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন ঘটনার দিনই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পারিবারিক কারণে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে। হিফজুরও সন্দেহের বাইরে নয়। এর বাইরে পুলিশ মামাদের সঙ্গে বিরোধসহ আরো কয়েকটি বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করে। কিন্তু কোনো অনুসন্ধানই ঘটনার কাছাকাছি যায়নি। পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।
পুলিশ জানায়, হিফজুর ও তার স্ত্রীর মধ্যে প্রায় সময় ঝগড়া হতো। এসব ঝগড়ার বিষয় আশপাশের লোকজনও জানতেন। এ নিয়ে সালিশও হয়েছিল। শুক্রবার ছিল হিফজুরের শ্যালিকার বিয়ে। এই বিয়েতে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে হিফজুর ও আলেয়ার মধ্যে মনোমানিল্য হয়। আর এই মনোমানিল্যের জের ধরে হিফজুর খুন করতে পারে স্ত্রী ও সন্তানদের- এমন ধারণা পুলিশের।
সিলেট ওসমানী এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন হিফজুর রহমান। পুলিশ পাহারায় তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দেয়নি। হাসপাতালে থাকা হিফজুর রহমানকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আটক করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) লুৎফর রহমান।
হিফজুর এখনো চিকিৎসাধীন। ঘটনার সময়ে ওই ঘরে ছিলেন হিফজুর রহমান। একমাত্র তিনিই বলতে পারেন কী ঘটেছে। আলেয়া ও দুই সন্তানের গলাকাটা ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও হিফজুরের আঘাত বেশি নয়। এ কারণে পুলিশ হাসপাতালের বেডে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, হিফজুর সন্দেহজনক কথা বলছেন। পাগলের মতো আচরণ করছেন। এ কারণে পুলিশের সন্দেহ গভীর হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে হিফজুরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুলিশ উড়িয়ে দিচ্ছে না। সুস্থ হলে হিফজুরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান। ঘটনার পর বুধবার সকালে পুলিশ হিফজুরের ঘর থেকে একটি বটি উদ্ধার করেছে। ওই বটি রক্তমাখা ছিল। এদিকে, মা ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় বুধবার রাতে সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় মামলা করেছেন নিহত আলেয়া বেগমের পিতা আইয়ুব আলী।
ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় নিহত গৃহবধূ আলেমার শরীরে নয়টি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। এগুলোর একটিই তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিল বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। এরপরও ঘাতক এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সেইসঙ্গে মৃত্যু ঘটে আলিমার গর্ভজাত পাঁচ মাসের কন্যা সন্তানেরও।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেসনিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আলিমার গর্ভে পাঁচ মাসের কন্যাসন্তান ছিল। একটি আঘাতে আলিমার লিভার কেটে গিয়ে গর্ভজাত সন্তানেরও মৃত্যু হয়। বুকের আঘাতে পাজর কেটে হার্টে গিয়ে লেগেছে। মাথার আঘাতটিও ছিল গুরুতর। এসব আঘাতের যেকোনো একটিই মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিল।
এছাড়া আটবছর বয়সী ছেলে মিজানের ঘাড়ের দিক থেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাড় ও খাদ্যনালী কেটে চামড়ায় ঝুলেছিল। চারবছর বয়সী মেয়ে তানিশার মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন মিলেছে বলেও নিশ্চিত করেছেন এ চিকিৎসক।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মরদেহগুলো ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ আল হেলাল।
এদিকে নিহত আলিমার বাবা আয়ুব আলীও জানিয়েছেন, আলিমা গর্ভবতী ছিল। গর্ভে পাঁচ থেকে সাত মাসের সন্তান রয়েছে।

মরদেহগুলো সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) দিলীপ কান্ত নাথ বলেন, দুই শিশুসহ মায়ের শরীরে অন্তত ১৭টি কোপ পাওয়া গেছে মর্মে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে গৃহবধূ আলিমার শরীরে নয়টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তন্মধ্যে মাথায় দু’টি গুরুতর আঘাত। বাম বাহুতে একটি, বুকে একটি আঘাতে পাজর কেটে গেছে। এছাড়া পেট ও পিঠে পাঁচটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার মাথায়, লিভার ও হার্ট পর্যন্ত আঘাত পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটা আঘাতই গুরুতর।

তিনি আরও বলেন, আটবছরের শিশু সন্তান মিজানের ডান গালে একটি, থুঁতনিতে একটি, বাম কানের নিচ থেকে ডান কানের কাঁধের নিচ পর্যন্ত গভীর আঘাত করা হয়েছে। চারবছরের শিশু মেয়ের মাথায় দু’টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। আরেকটি ঘাড়ে। সেটি ছিল মারাত্মক। তাছাড়া আহত হিফজুরের মাথায় একটি ও পায়ে দু’টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো হালকা জখম। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন শেষে নিহতদের মরদেহ আলিমার বাবা আয়ুব আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এছাড়া গর্ভজাত সন্তান হত্যার বিষয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন বলেন, গর্ভজাত সন্তান হত্যার বিষয়টি এ তিন হত্যাকাণ্ডর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাতে চারটি হত্যার ঘটনা হবে না।

বুধবার (১৬ জুন) ভোরে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় বসতঘর থেকে দুই শিশুসহ গৃহবধূর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন- উপজেলার ফতেহপুরের বিন্নাকান্দি ফুলেরতল গ্রামের হিজবুর রহমানের স্ত্রী আলেমা বেগম (৩৫), ছেলে মিজান (৮) ও মেয়ে তানিশা (৫)। এ সময় ঘর থেকে গুরুতর অবস্থায় গৃহকর্তা হিফজুর রহমানকে উদ্ধার করা হয়। তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

গোয়াইনঘাট থানার ওসি আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হলে পুলিশ তদন্ত রিপোর্টে আসামিদের নাম সংযুক্ত করবে। ঘটনাটিকে পুলিশ গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে বলে জানান তিনি।

সৌজন্যেঃ- দৈনিক জৈন্তাবার্তা

(সি/স-১৮ জুন-তা/ই)