৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে “মৃত্যু”

প্রকাশিত: ১১:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
Oplus_131072

 

সংবাদ ডেস্ক: অভাবের সংসারে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে খাবার জোগাড়ের আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিলেন শেরপুরের বৃদ্ধ সাজু শেখ (৮৮)। তাঁর অসহায়ত্বের কথা জেনে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকজন। পেয়েছিলেন সহায়তাও। কিন্তু দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কেড়ে নিল তাঁর জীবনসঙ্গীকে। প্রায় ৭০ বছর একসঙ্গে কাটানোর পর গতকাল রোববার মারা গেছেন সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ইলিয়াস মিয়া ৮২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যান ওই নারী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। এদিন বিকেল পাঁচটার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন আর সংগ্রামে একে অপরের সঙ্গী ছিলেন সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে ছিলেন সাজু। এখন সেই সঙ্গীকে হারিয়ে তাঁর বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এর পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি। ধীরে ধীরে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। প্রয়োজন ছিল নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই ব্যবস্থা করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।

স্ত্রীর অসুস্থতার পর সাজু শেখের জীবনও যেন থমকে যায়। নিজের বার্ধক্য ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনায় কার্পণ্য করেননি তিনি। একদিকে স্ত্রীর সেবা, অন্যদিকে খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো তাঁকে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সাজু শেখের একটি ভিডিও। সেখানে অসুস্থ স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে খাবারের জন্য আকুতি জানাতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, আর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন ও সংগ্রামের চিত্র। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তাঁদের দুরবস্থার কথা জানতে পারেন। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং সহায়তাও দেওয়া হয়।

সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তাঁরা মাঝেমধ্যে মা-বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনা মহামারির সময় নিখোঁজ হন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরে থাকা ছোট ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি করেন, ঠেলাগাড়িও চালান। কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাঁর তিন মেয়ে। নিজের সংসার চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়।

দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন আর সংগ্রামে একে অপরের সঙ্গী ছিলেন সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে ছিলেন সাজু। এখন সেই সঙ্গীকে হারিয়ে তাঁর বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

নূরজাহানের মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিনও। তিনি বলেন, গতকাল নূরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারটির সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। কর্মসংস্থানের জন্য দেওয়া হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের অনেক সহৃদয়বান মানুষ পরিবারটির সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন।