দয়া করে হেফাজতকে ‘কাজী অফিস’ বানাবেন না।

Desk Desk

News

প্রকাশিত: ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২১

——————————————————–
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের একাংশের নেতারা (মামুনুলপন্থী) তড়িঘড়ি বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে তারা জানিয়েছেন, মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ে শরীয়তের আলোকে সম্পূর্ণ শুদ্ধ। সুতরাং তার দ্বিতীয় স্ত্রী বা অবকাশযাপন নিয়ে বিভ্রান্তির কিছু নেই।

আমরা হেফাজত নেতাদের কথায় আশ্বস্ত হতে চাই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই মামুনুল হক তার বিয়ে করা স্ত্রী নিয়েই হোটেলে গিয়েছিলেন। সেখানে যারা তার অবকাশে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, তার সম্মানহানি করেছে, তার ফোনালাপ ফাঁস করেছে তারা সবাই দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করেছে। অপরাধ করেছে। তাদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু সব কথা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। কিছু কথা, কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলানো দরকার।

শরীয়তের দৃষ্টিতে মামুনুলের বিয়ে শুদ্ধ হয়েছে ভালো কথা, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে কী শুদ্ধ হয়েছে? হয়নি। এখন পর্যন্ত আমরা মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ের কাবিন বিষয়ে কিছু জানি না। কেউ তার কাবিনের সত্যতা প্রমাণ করতে এগিয়ে আসেনি। মামুনুল নিজেও না।

কেনো মামুনুলের মতো একজন মানুষ রাষ্ট্রের আইন মানবেন না? বিয়ে নিবন্ধনের মতো একটা জরুরী আইন কেনো অমান্য করলেন? ঘাপলা কোথায়?

মামুনুলসহ সংশ্লিষ্ট যাদের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে সেগুলোকে কেউ কেউ ফেইক বলে প্রচার করার চেষ্টা করলেও আমাদের কাছে ফেইক মনে হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত মামুনুল নিজে এগুলোকে ফেইক বলে দাবী করেননি। সুতরাং তার এবং তাদের কথা-বার্তায় পরিস্কার বোঝা যায় মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ের খবর প্রথম স্ত্রী জানেন না। দুই বছর যাবত তিনি দ্বিতীয় বিয়ে গোপন করেছেন প্রথম স্ত্রীর কাছে। (প্রথম স্ত্রীকে জানিয়ে বিয়ে করেছেন বা পরে জানিয়েছেন এমন দাবী মামুনুল নিজেও করেননি) এই কাজ করতে গিয়ে তাকে নিশ্চই অনেক ছল-চাতুরি এবং মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রথম স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করতে হয়েছে। এগুলো তিনি কেনো করলেন? শরীয়তের দৃষ্টিতে এ জাতীয় অপরাধের শাস্তি কী?

হেফাজতের নেতারা বৈঠক করে বলেছেন, মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ে শরীয়তের আলোকে বৈধ। এর অর্থ মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা দেয়া, তার ব্যক্তিগত অপরাধের বৈধতা দেয়ার দায় হেফাজত নেতারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সুতরাং এসব প্রশ্নের উত্তর তারা এখন আর এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাদেরকেও জবাবদিহি করতে হবে। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সামনে ফের গলাতুলে কথা বলার আগে পরিস্কার করে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

ইসলাম হলো ইনসাফের ধর্ম, মামুনুল যতটুকু অপরাধ করেছেন এতটুকুর ইনসাফ ভিত্তিক শাস্তি কী? আমরা বলছি না রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে তাকে কোনো শাস্তি দিতে, কিন্তু শরীয়া আইন থাকলে তার কী শাস্তি হতো তা পরিস্কার করে বলতে হবে।

মামুনুল পেশায় একজন মাদরাসার শিক্ষক। তিনি নাকী ২০ বছর যাবৎ হাদিস পড়ান। আমরা জানি কোনো মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে হাদিস নেয়া নিষেধ। মামুনুল প্রকাশে মিথ্যা বলেছেন। প্রতারণা করেছেন। তিনি হোটেল রেজিস্টারে দ্বিতীয় স্ত্রীর নামের পরিবর্তে প্রথম স্ত্রীর নাম লিখেছেন। লাইভেও প্রথম স্ত্রীর নাম বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। এমন মিথ্যা বলা একজন মানুষের কাছ থেকে কী হাদিসের দরস নেয়া বৈধ হয়? তার কাছ থেকে নেয়া সনদের বৈধতা থাকে? দেশের নির্ভরযোগ্য মুফতিদের কাছ থেকে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

মামুনুল হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। এতকিছুর পরেও কী তিনি এমন দুইটি আদর্শিক দলের দায়িত্বশীল পদে থাকতে পারেন? নেতৃত্ব দিতে পারেন? তার এমন চরিত্র প্রকাশ পাওয়ার পরেও কোনো ইসলামপন্থী দল বা সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক অধিকার থাকে?

দেশের ইসলামপন্থী যুবকদের মধ্যে মামুনুলের একটা জনপ্রিয়তা আছে। বহু যুবক তাকে আইডল মনে করে। তার কথায় জীবনবাজি ধরতেও তারা দ্বিধা করে না। এই যুবকদের কাছে কী বার্তা পাঠালেন আপনারা? তারাও কী এখন দলে দলে গোপন বিয়ে করা শুরু করবে? পরিস্কার দিকনির্দেশনা দিতে হবে আপনাদের।

আমরা সবাই জানি পুরুষের জন্য শর্ত সাপেক্ষে ইসলাম ৪টা পর্যন্ত বিয়ে করার সুযোগ রেখেছে। মামুনুল কী দ্বিতীয় বিয়ের সময়ে শর্তগুলো মেনেছেন? কী কী মেনেছেন, কী কী মানেননি তা পরিস্কার করে বলতে হবে। কারণ হেফাজতের নেতারাই তার দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার দায় নিয়েছেন। ফলে তাদের সাংগঠনিক দৈন্যতা প্রকাশ পেয়েছে সেদিকে ফিরেও তাকাননি।

২০ জন শহীদের রক্তের দাগ এখনো মোছেনি। সাড়ে ৪ হাজার মানুষ আহত হয়ে চিকিৎসার অভাবে গোঙ্গাচ্ছে। হাজার হাজর মানুষ জেলখানায় বন্দি। উকিলের অভাবে, টাকার অভাবে তাদের জামিন হচ্ছে না। আর আপনারা মেতে উঠেছেন, একজন মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা নিয়ে। ঘরে বাইরে, হাটে বাজারে, সোস্যাল মিডিয়ায় আপনাদের ‘জিহাদ’ করতে হচ্ছে মামুনুলের অপরাধ ঢাকতে। এর থেকে তো মনে হয় আপনাদের জন্য ‘আত্মহত্যা’ বেশি সম্মানের ছিল।

হাফেজ শহিদের বড় ছেলে সোস্যাল মিডিয়ায় কিছু কথা বলেছে। তা নিয়েও একদল কওমীপন্থী জেহাদি ঝাপিয়ে পড়েছে। কী অদ্ভুত বেপার! তারা একবারও ওই শিশুটার মনে অবস্থা বুঝলো না। এতটুকু একটা ছেলে, সোস্যাল মিডিয়ায় এসে নিজের মাকে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। অস্বস্তির কথা, বিব্রত হওয়ার কথা। তারা এই দিকটা একবারও ভাবছে না।

অন্যান্য সমালোচকদের কথা না হয় বাদই দিলাম, ছোট ছেলেটাকেও রেহাই দেননি, দিচ্ছেন না আপনারা। আপনাদের প্রতি কীভাবে আস্থা রাখবে দেশের মানুষ? কীভাবে নিজেদের মানবিক দৈন্যতা ঘুচাবেন? কীভাবে নিজেদের ক্ষমা করবেন?

একজন মামুনুলের অপরাধে, অপরিপক্কতায়, একগুয়েমিতে আজ গোটা দেশের ইসলামপন্থীরা বিব্রত, বিদ্ধস্ত, ব্যাপক ক্ষতির মুখে। তবু বলবো- এই ক্ষতি সাময়িক। এই ক্ষতি পুশিয়ে উঠা সম্ভব, যদি হেফাজতসহ দেশের ইসলামপন্থী নেতারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। আর তারা যদি হেফাজতকে ‘কাজী অফিস’ বানাতে চান, কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতে চান, ইনসাফ না করেন তবে আগামীতে আরো বড় ক্ষতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার। অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়ার ফল ভোগ করার জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। এবং তা দুই কালেই।

বাংলাদেশের আলেম পরিবারের মধ্যে মামুনুল হলো ‘রয়েল’ পরিবারের সন্তান। তার বাবা আজিজুল হক সাহেব এই খ্যাতি এনে দিয়েছেন। সেই পরিবারের সন্তানের এমন অধপতন কারো জন্যেই সম্মানজনক নয়। আপনারা নিশ্চই দেখেছেন, মামুনুল যখন তার ভাইদের নিয়ে লাইভে বলছিলেন, ঝর্নার সাথে তার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছে, তখন লজ্জায় সব ভাই মাথা নিচু করে রেখেছিলেন। তারা হয়তো কোনো দিনও ভাবেননি, এমন একটা পচা বিষয় নিয়ে জাতীর সামনে বসতে হবে, মুখ দেখাতে হবে। তারা অসহায়ের মতো শুধু শুনেছেন, মামুনুলের কথায় মাথা নেড়েও কেউ সম্মতি জানাননি।

মামুনুলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আরো আছে। ছাত্র জীবনে তিনি তার বাবার মাদরাসা থেকে বহিস্কৃত হয়েছিলেন। চাকরী জীবনে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। এগুলো এখন ভাসছে সোস্যাল মিডিয়ায়। সুতরাং হুজুকে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। মনে রাখবেন কারো দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা দেয়ার জন্য হেফাজতের জন্ম হয়নি। মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা দেয়ার জন্য দেশের যুবকরা জীবন-যৌবন বাজি ধরে হেফাজতের ডাকে সাড়া দেন না।

মামুনুল দেশের ইসলামপন্থীদের ইতমধ্যে অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলেছেন। এই ক্ষতি আর বাড়তে দিবেন না দয়া করে। তার অপরাধের প্রাশ্চিত্ব তাকেই করতে দেন। এই দায় আপনারা কাধে তুলে নেবেন না। তার অপরাধ আপনারা বহণ করবে না। তাতে দেশের ইসলামপন্থীদের অপূরর্ণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। যা কাটিয়ে উঠা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

কওমিপন্থী যারা এখনো মামুনুলের অপরাধের বৈধতা দেয়ার জন্য বা তার দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা দেয়ার জন্য লড়াই করছেন তারা দয়া করে একটু নিজের মাথা দিয়ে ভাবুন। সারাদিন যা’ই করেন না কেনো, রাতে যখন বিছানায় যাবেন তখন অন্তত নেতার মাথা দিয়ে না ভেবে নিজের মাথা দিয়ে ভাবুন। একজন মামুনুল হককে রক্ষা করতে গিয়ে হাজার হাজার মামুনুল হকদের (তার ভাল দিক বিবেচনায়) ভবিষ্যৎ ঝুকির মধ্যে ফেলে দেবেন না।

বাংলাদেশ এখন এক ‘চরম মুহুর্ত’ অতিক্রম করছে। সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ভয়ানক এক খেলায় মেতে উঠেছে। তারা দেশে এক দীর্ঘ মেয়াদী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চায়। ধার্মিক, অধার্মিকে বিরোধ সৃষ্টি করতে চায়। এই খেলার একটা ঘুটি মাত্র মামুনুল হক। এখন দেখার বিষয় দেশের ইসলামপন্থীরা এই অস্থির সময়ে কী ঘুটির চাল দেয়। তারা কতোটা দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারে এর উপর নির্ভর করবে সরকার সফল হবে কী হবে না। দেশে ইসলামের রাজনীতি থাকবে কী থাবে না।

হেফাজত ও মজলিসের পদ থেকে মামুনুল হককে অব্যাহতি দেন। হাদিসের শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি দেন। তাকে নিজের সাথে বোঝাপড়া করার, পরিবারের সাথে বোঝাপড়া করার সময় দেন। নিজেকে নতুন করে ‘নির্মান’ করার সুযোগ তৈরী করে দেন। আপনারাও ঐতিহাসিক নজির সৃষ্টি করুন। ইসলাম যে সবার জন্য ‘ইনসাফ’ তা প্রমাণ করুন। দেশের গণমানুষের হৃদয়ে ইসলামপন্থীদের প্রতি যে ভালোবাসা আছে তাকে সম্মান করুন।

মনে রাখবেন শুধুমাত্র ঝাঝালো বক্তৃতা করতে পারা, যুবকদের উত্তেজিত করতে পারাই নেতৃত্বের যোগ্যতা নয়। নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন মানুষদের হাতে নেতৃত্ব কখনো নিরাপদ হয় না। যা আমাদের দেশ দিয়েও বিবেচনা করা যায়।

অতি আবেগিরা হয়তো এখনো বুঝতে পারছেন না সরকার কী গভীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে। নতুন করে ওই ফাঁদে আর জড়াবেন না, পা দেবেন না দয়া করে। সরকারের ষড়যন্ত্রের জাল অনেক বড়। তাদের টার্গেট একজন মামুনুল নয়। তাদের টার্গেট দেশের গোটা ইসলামপন্থীরা। সুতরাং সরকারের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের আর ‘বলির পাঠা’ বানাবেন না। দেশের ইসলামপন্থী নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী যখন সংসদে দাঁড়িয়ে মামুনুলকে নিয়ে কথা বলেন, তিনি যখন মাদরাসায়, হেফাজত নেতাদের বাড়িতে আগুন লাগার কথা বলেন তখন চিন্তাশীল কারোরই বুঝতে বাকী থাকে না ষড়যন্ত্রের শেকড় কতো গভীরে। সুতরাং ফাঁদে পা দেবেন না দয়া করে। সরকারকে দোষী করতে গিয়ে মামুনুলের অপরাধ ধামাচাপা দেবেন না। তাতে আরো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাবে।

আপনাদের বুঝতে হবে- এগুলো করে সরকার দেশের মানুষকে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। তারা ইসলামপন্থী এবং সাধারণ মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তারা ইসলামপন্থী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্র তৈরী করছে। সুতরাং একজন মামুনুল হকের জন্য আবেগি যুদ্ধ করে গোটা ইসলামপন্থীদের বিপদ ডেকে আনা কোনো দূরদর্শিতার পরিচয় হবে না।

লেখকঃ পলাশ রহমান
ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক