সব কিছুর নিয়ন্ত্রক ওসি সজল কানু- ৫ মাসেই কোটিপতি/পর্ব ১ Desk Desk News প্রকাশিত: ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২০ ষ্টাফ রিপোর্টার -সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ। পাথর সাম্রাজ্য হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। কারণ এখানে রয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারী ভোলাগঞ্জ ধলাই নদী । এছাড়াও রয়েছে উৎমা নামে আরও একটি পাথর কোয়ারী। তাছাড়াও পাথর উত্তোলন হয় কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরফিন টিলা ও কালাইরাগ থেকে। কোম্পানীগঞ্জবাসীর জীবিকার মূল উৎস হচ্ছে পাথর। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য যেন পাথর দিয়ে মোড়ানো। পাথর ব্যবসা বন্ধ হলে চুলো জ্বলে না সিংহভাগ মানুষের ঘরে। পাথর কোয়ারী সচল থাকলে দু’বেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে জীবনধারণ করে থাকেন তারা। এমনকি সন্তানাদিদের পড়ালেখার খরচও যোগান দিয়ে থাকেন। বর্তমানে সেই পাথর সাম্রাজ্যের বাসিন্দারা ভালো নেই। আহারে অনাহারে দিনাতীপাত করছেন তারা। কারণ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পাথর কোয়ারীগুলো বন্ধ। তবে সেখানে পাথর উত্তোলন সচল থাকলে পাথর ব্যাবসায়ী ও শ্রমিকদের চাইতে বেশি ফায়দা হাসিল করে থাকেন স্থানীয় প্রশাসন। পাথর সাম্রাজ্যে এখন একক অাধিপত্য বিস্তার করে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা ছাড়া কিছুই হয় না। পাথর উত্তোলন করতে হলে পুলিশকে দিতে হয় বিপুল পরিমাণ টাকা। বিগত দিনে দেশের সর্ববৃহৎ পাথর সাম্রাজ্যে একক অাধিপত্য বিস্তার করেছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সজল কুমার কানু। তাকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত বিতর্কের অন্ত নেই। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলান তিনি। হয়ে যান বহুরূপী। যোগদানের পর থেকেই নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সজল কানু। যোগদানের সাপ্তাহখানেকের মধ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন কোম্পানীগঞ্জের পাথর কোয়ারীগুলোতে। পাশাপাশি গরু চোরাকারবারিদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জের সীমান্ত। অবৈধ পন্থায় উপার্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা। ওসি সজল কানুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যাপক অভিযোগ থাকা স্বত্বেও ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না জেলা পুলিশ। জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরের ২৮ তারিখ কোম্পানীগঞ্জ থানার দায়িত্ব বুঝে নেন ওসি সজল। থানায় যোগদানের পরপরই নিযুক্ত করেন বেশ কয়েকজন ব্যক্তিগত লাইনম্যান ও সোর্স। পাথর কোয়ারীগুলোতে পাথরের গর্ত, পাথর উত্তোলনের লিস্টার মেশিন এবং পে-লোডার মেশিন মালিকের কাছ থেকে পুলিশের নামে উত্তোলন হতে থাকে চাঁদা। সীমান্তে গরু চোরাকারবারি ও মাদককারবারিদের কাছ থেকে আদায় হয় ওসির নামের কমিশন। আবার কমিশনে গড়মিল হলেই প্রয়োজনবোধে গরু চোরাকারবারি কিংবা মাদককারবারিকেও পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয় পুলিশের সেইসব লাইনম্যান ও সোর্সরা। কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদী পাথর কোয়ারী, উৎমা পাথর কোয়ারী, শাহ আরফিন টিলা ও কালাইরাগে নিয়োজিত ছিলো পুলিশের ডজনখানেক লাইনম্যান। এসব লাইনম্যানদের মাধ্যমে শত শত পাথরের গর্ত থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করা হতো পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কথা বলে। তবে সেই টাকাগুলো ওসির পকেটে ঢুকতো। উক্ত টাকাকে বলা হয় ‘প্রোটেকশন মানি’। গর্ত বা মেশিন মালিকেরা উক্ত প্রোটেকশন মানি না দিলে টার্গেট করে সেসব গর্ত ও মেশিনে চালানো হতো তথাকথিত অভিযান। ভেঙে ফেলা হতো ট্রাক্টর গাড়ি ও লিস্টার মেশিন, ধরে নিয়ে আসা হতো থানায়। থানায় আসার পর গোপনে আবার রফাদফাও হয়ে যেত। অথচ সাধারণ জনগণ ও মিডিয়াকে আইওয়াশ করা হতো যে, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে এসব অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে বর্তমানে পাথর কোয়ারী বন্ধ থাকলেও ওসির নির্দেশে দিনে এবং রাতে চুরি করে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর। সেই পাথর ট্রাক্টর গাড়ির বদলে ছোট ছোট ট্রলি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্যত্র। এরপর ওসি সজল হাত বাড়ালেন চোরাচালানের দিকে। ভারতীয় গরু চোরাচালানের নতুন রুট হিসেবে আবিষ্কার করলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উৎমা সীমান্তকে। বিজিবি ও পুলিশকে ম্যানেজ করে উৎমা সীমান্ত দিয়ে অবাধে প্রবেশ করতে থাকে ভারতীয় গরু। প্রতিটি গরু হতে পাঁচশত থেকে এক হাজার টাকা করে কমিশন দিতে হয় ওসিকে। কমিশন পরিশোধ করার মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত গরু দেশে প্রবেশ করছে এই উৎমা সীমান্ত দিয়ে। এছাড়া সীমান্তবর্তী বাজার বড়পুঞ্জি ও থানচিনিতেও নিযুক্ত রয়েছে ওসির লাইনম্যান। মাসে মাসে নিলাম হয় এই দুটি বাজার। এই নিলামেরও ভাগ আসে ওসির পকেটে। ওসির থাবা থেকে বাদ যায়নি ভাঙাড়ি দোকানও। কোম্পানীগঞ্জের টুকেরবাজারে অবস্থিত প্রায় ২৫টি ভাঙাড়ি দোকান। সেই ভাঙাড়ি দোকানগুলো থেকে প্রতি মাসে পাঁচশত টাকা করে মাসোহারা নিয়ে থাকেন ওসি সজল কানু। সব মিলিয়ে গত ৫ মাসে প্রোটেকশন মানি, কমিশন ও মাসোহারার মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওসি। আর এসব ঘটনায় জড়িত আছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার আরও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাও। তবে সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন ইতোমধ্যে কয়েকজনকে ক্লোজডও করেছেন। তার মধ্যে এএসআই সিরাজ ও এএসআই মাহফুজকে ২০ এপ্রিল এবং এসআই রাজিব চৌধুরীকে ২১ এপ্রিল ক্লোজড করা হয়। এএসআই সিরাজ ও মাহফুজ ওসির লাইনম্যান হিসেবে কালাইরাগ এলাকার পাথরের গর্ত থেকে টাকা উত্তোলন করতেন। ওসি সজল কানু বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের কাছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডাকাতি বন্ধের দাবি করলেও সন্ধ্যার পর থেকেই বহাল তবিয়তে চলেছিলো বর্ণি কাটাখাল এলাকায় যানবাহনে ডাকাতি। কিন্তু গত ৫ মাসে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি ডাকাতির ঘটনাকে মিথ্যা এবং ভূয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ওসি সজল। প্রমাণ থাকা স্বত্বেও তখন গ্রহণ করেননি মামলা। একইভাবে পাথর কোয়ারীগুলোতে মাটি ধসে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আবার একাধিক লাশ উদ্ধারও করা হতো। লাশ গুমও করে ফেলা হতো। অবশেষে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা থেকে পাথর শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিলো উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হস্তক্ষেপে। এই গুম ও রফাদফায়ও ওসি পেতেন মোটা অঙ্কের টাকা। এ বিষয়ে জানতে ওসি সজল কানুকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। কথায় আছে ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’ কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সজল কুমার কানু তার অপকর্মের জালে নিজেই ফেঁসে গেছেন। একের পর এক বেরিয়ে আসছে তার অপকর্মের তথ্য। বর্তমানে সিলেটের পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ওসি সজলের বিরুদ্ধে চলছে তদন্ত। এতকিছুর পরেও থেমে নেই ওসি। তিনি এখন স্থানীয় এক সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করারও পায়তারা করছেন। (সি/স-২২ এপ্রিল -তা/ই) SHARES অপরাধ বিষয়: