যেভাবে বেরিয়ে এলো থলের বেড়াল / পর্ব-২

Desk Desk

News

প্রকাশিত: ৯:১১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২০

ষ্টাফ রিপোর্টার:- কোম্পানীগঞ্জ থানায় যোগদানের আগে সিলেট জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী সেলের ইনচার্জ ছিলেন সজল কুমার কানু। সে সময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে বহুবার এসেছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। একবার মাদকবিরোধী এক অভিযান চালানো শেষে পুলিশের এক সোর্সের মাধ্যমে ওসি সজলের সাথে পরিচয় হয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মাঝেরগাঁও গ্রামের তোফায়েল নামের এক যুবকের। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ওসি সজলকে গোপনে মাদকের চালানের খবর জানাতেন তোফায়েল। সেই থেকে সখ্যতা শুরু তাদের। কোম্পানীগঞ্জে যোগদানের পর তোফায়েলকে স্মরণ করেন ওসি সজল। থানায় ডেকে নিয়ে তোফায়েলের উপর দেন পাথর কোয়ারী থেকে চাঁদা উত্তোলনের লাইনম্যানের দায়িত্ব। প্রতিদিন ৫শ টাকা বেতনে প্রথমে শুধু পাথর কোয়ারি থেকে ওসির নামে টাকা উত্তোলন করলেও পরবর্তীতে ভারতীয় গরুর চালান থেকে চাঁদার টাকা তুলতে তোফায়েলকে নির্দেশ দেন ওসি সজল কানু । তোফায়েলের সাথে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতো নিজাম নামে এক ব্যক্তি। কোনো এক কারণে লাইনম্যান নিজামের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য থানার দুই এসআই ৷ নিজামকে লাইনম্যানের চাকরি থেকে বরখাস্তও করেন। তাতেও ওসি সজলের রাগ কমেনি। তোফায়েলকে ফোন দিয়ে নিজামকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন। এই অবস্থায় থানায় গিয়ে মামলা থেকে নিজামের নাম কাটানোর জন্য এসআই মিজান ও রাজীবের কাছে ৮৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে আসেন তোফায়েল ও নিজাম। কিন্তু এরপরও পুলিশের হুমকি ধামকি থামেনি। লাইন চ্যুত করা হয় তোফায়েলকেও।

এরইমধ্যে ওসি সজল কুমার কানু ও লাইনম্যান তোফায়েলের মধ্যকার কথোপকথনের ও নিজামকে হুমকির একটি অডিও ক্লিপ চলে যায় সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিনের কাছে। সেখান থেকে আবার সেটি চলে আসে ওসি সজল কানুর মোবাইলে। আরো ক্ষুব্ধ হন সজল কানু। পুলিশ পাঠিয়ে হুমকি দেন তোফায়েল ও নিজামের বাড়িতে। সেই থেকে তারা দুজনে প্রাণভয়ে পলাতক রয়েছে। প্রাণের ভয়ে তোফায়েল হুমকির অডিও ক্লিপসহ বিষয়টি সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. মাহবুবুল আলমকে জানান। তিনি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
এরপর নানা হাত ঘুরে গণমাধ্যমের হাতে আসে তোফায়েলের মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত একটি মেমোরি কার্ড। সেই মেমোরি কার্ড থেকেই বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। ওসি সজল কুমার কানুসহ কোম্পানীগঞ্জ থানার অনেক পুলিশ কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকান্ডের তথ্যপ্রমাণ বেরিয়ে আসে মেমোরি কার্ড থেকে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে একের পর এক আপলোড করা হয় ফোনালাপের অডিও ক্লিপ। যেখানে ওসি বলছেন গরু চোরাকারবার, পাথর কোয়ারি থেকে চাঁদা ও মাটি কর্তনে ব্যাবহৃত ফেলোডার মেশিন থেকে চাঁদা উত্তোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে।
সিলেটের বেশ কয়েকটি স্থানীয় এবং জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বের সাথে ছাপানো হয় প্রতিবেদনটি। টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. মাহবুবুল আলমকে প্রধান করে চলতি মাসের শুরুতে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। ৭ এপ্রিল নেয়া হয় নিজাম ও তোফায়েলের জবানবন্দি।
কিন্তু চালাক ওসি সজল তার অপকর্ম ঢাকতে ব্যবহার করেছেন অভিনব কৌশল। তিনি তার বিরুদ্ধে করা প্রতিটি নিউজের বিপরীতে নিজের পক্ষে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে নিউজ করাতে শুরু করেন। পাশাপাশি কোম্পানীগঞ্জ থানার সরকারি পুকুরের মাছ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিতরণ করে ছবি তুলেন এবং তা দিয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য স্থানীয় কিছু অনলাইন পোর্টালের সাহায্য নেন। মূলত ওসি কানুর বিরুদ্ধে নিউজ করার আগে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য সাংবাদিকেরা ফোন করেন। এই ফোন পাওয়ার পরপরই ওসি বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে লিপ্ত হন। সম্প্রতি কিছুদিন আগে সিলেটের পুলিশ সুপারের কাছে ভালো সাজার জন্য উপজেলার কেছুটিলা গ্রামে একটি পরিবারকে রাতের খাবার খাইয়ে আসেন ওসি সজল কানু। কিন্তু স্থানীয়রা জানান, খাওয়ানো নয়, ছবি তোলাই মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল আগন্তুক পুলিশের।
সিলেট জেলায় এত ওসি থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত ওসি সজল কানুর এসব জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড এসপি সিলেট ফেসবুক আইডি থেকে একাধিকবার শেয়ার দেয়া হয়েছে। নানা অভিযোগ থাকা স্বত্বেও সজল কানু গত ফেব্রুয়ারী মাসে নির্বাচীত হয়েছেন সিলেট জেলার শ্রেষ্ট ওসি। সম্প্রতি কিছুদিন আগে গোয়াইনঘাট উপজেলার নোঁয়াগাও গ্রামে একটি বাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত চলে গোপন বৈঠক। সূত্রের খবর অনুযায়ী, সিলেট জেলা পুলিশের এক কর্তাব্যক্তির নির্দেশে নিউজ থামানো ও সাংবাদিক ম্যানেজের জন্যই বসেছিল ওই গোপন বৈঠক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের কিছু গনমাধ্যমকর্মী ও পুলিশের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি । ওই বৈঠকের পরপরই পল্টি মারেন কোম্পানীগঞ্জের এক সিনিয়র সাংবাদিক। এর আগ পর্যন্ত তিনি কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সজল কানুর বিরুদ্ধাচারণ করছিলেন। মিটিংয়ের পর আচমকাই তিনি ওসি কানুর ঘনিষ্ঠজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তোলপাড়। কিন্তু সেই বৈঠকের ব্যাপারটি অস্বীকার ও গোপন করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সজল কুমার কানুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা স্বত্বেও এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে। তারা বলছেন, কোম্পানীগঞ্জ থানা সৃষ্টির পর থেকে সবচেয়ে বিতর্কিত ওসি এই কানু। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এবং হবে। ওসি সজল কুমার কানুর বিরুদ্ধে স্থানীয় কোনো সাংবাদিক নিউজ করলে তাকে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়। ওসির দুর্নীতির তথ্য নিয়ে নিউজ করায় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিলকো সংবাদের সম্পাদক ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ দায়ের করানো হয়। এখনো মামলাটি রেকর্ড করা না হলেও তার বাড়িতে বারবার পুলিশ পাঠিয়ে হুমকি এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ওসি সজল কানু বলেন, পাবলিক অভিযোগ দিছে। মামলা এখনো রেকর্ড করা হয়নি। তদন্ত চলছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগের ব্যাপারে প্রশ্ন করার আগেই তিনি ফোন কেটে দেন।
এ ব্যপারে গোয়াইনঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, ওসি সজল কুমার কানুর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এসপি স্যার এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তুমি এসপি স্যারকে ফোন দাও।
২১ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে সিলেটের পুলিশ সুপার মোঃ ফরিদ উদ্দিন পিপিএম এর সরকারি নাম্বারে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি বারবার লাইন কেটে দেন।

(সি/স-২২ এপ্রিল- তা/ই)