শিবির সন্ত্রাসের শিকার চাঞ্চল্যকর ৩ হত্যাকান্ডের ৩২ বছরেও বিচার হয়নি Desk Desk News প্রকাশিত: ১২:০৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ সিলকো ডেস্ক:-আবহমান কাল থেকে সিলেট পরিচিত ছিল প্রগতিশীল আন্দোলন আর সংস্কৃতিচর্চার চারণভূমি হিসেবে। সবকটি গণআন্দোলনে, সাংস্কৃতিক জাগরণে সিলেটের পুণ্যভূমি বারবার সাড়া দিয়েছে। সিলেটের সেই পরিচিতির বুকে বড় আঘাত আসে ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮ সালে। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও জাসদ ছাত্রলীগের তিন তুখোড় কর্মী মুনির ই কিবরিয়া, তপন জ্যোতি দেব এবং এনামুল হক জুয়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করে প্রগতিবিরোধীরা। সেই হত্যাকাণ্ডের ৩২ বছর পূর্ণ হলো আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের ৩২ বছর পেরোলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে জামাত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত সেই হত্যাকারিরা। জানা যায়, সিলেটের ছাত্র রাজনীতির মাঠে তখন বাম ধারার ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে জাসদ ছাত্রলীগের অবস্থান ছিল অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর থেকে বেশি শক্তিশালী। শিবির সিলেটে প্রকাশ্যে তাদের রাজনীতি শুরু করতে গেলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতার কারণে তাদের সব উদ্যোগ ভেস্তে গেলে একই দিনে হত্যা করে জাসদ ছাত্রলীগের মুনির, তপন ও জুয়েলকে। সিলেটের প্রগতিশীল ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে কোনো শিবির ক্যাম্পাসে তাদের পক্ষে প্রকাশ্য তৎপরতা চালিয়ে যেতে পারছিলো না। সিলেটকে তারা কয়েকটি এলাকায় ভাগ করে শুরু করে এলাকাভিত্তিক রাজনীতি। আলিয়া মাদ্রাসার মধ্যে অন্য কোনো প্রগতিশীল সংগঠনের কার্যক্রম না থাকায় তারা মাদ্রাসা ক্যাম্পাসকে দখলে নেয়। শিবিরকে প্রতিরোধ করার জন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সিলেটে গঠন করা হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তখন ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রলীগ। আশির দশকের ছাত্রলীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মুনির-তপন-জুয়েল ছিল সিলেটের প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক। তাদের হত্যার মধ্য দিয়ে সিলেটে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি শুরু হয়। আলোচিত এ হত্যা মামলার সাক্ষীরা বিভিন্ন কারণে প্রভাবিত হওয়ার কারণেই ন্যায়বিচার পায়নি মুনির, তপন ও জুয়েলের পরিবার।’ আশির দশকের তৎকালীন সিলেট জেলা জাসদ ছাত্রলীগের সদস্য ও বিএনপি নেতা জিয়াউল গণি আরেফিন বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ৪০-৪৫ বছর আগের মামলাগুলোরও বিচার হচ্ছে। যদি এমনভাবে মুনির-তপন-জুয়েল হত্যার বিচার শেষ করা হয়, তাহলে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। বিচারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও বাড়বে। আমরা চাই, ৩২বছর পরে হলেও বিচার হোক মুনির-তপন-জুয়েল হত্যাকাণ্ডের।’ তিনি আরও জানান, পৈশাচিকভাবে মুনির-তপন-জুয়েলকে জামায়াত শিবির হত্যা করেছে। যা কল্পনা করা যায় না। এসময় পুলিশও জামায়াত শিবিরকে সহযোগীতা করে। সিলেটের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মিশফাক আহমদ মিশু বলেন, মুনির-তপন-জুয়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে জামায়াত-শিবির। এই হত্যাকাণ্ড এতটাই বর্বর, যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আমরা প্রতি বছরই মুনির-তপন-জুয়েলকে স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছে আসছি দীর্ঘদিন থেকে। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার যখন ক্ষমতা বসলেন তখন অনেক পুরাতন মামলারও বিচার হচ্ছে। যেসব মামলার বিচার হবে কিনা অনেকের সন্দেহ ছিল। কিন্তু যারা অন্যায় করেছে তারা শাস্তি পেয়েছে। আমিও আশাবাদী এই সরকারের আমলেই জামায়াত-শিবিরের হাতে খুন হওয়া অত্যান্ত মেধাবীরা ছাত্রনেতা মুনির-তপন-জুয়েলের বিচার হবে। সূত্র আরও জানায়, ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে সিলেটের ছাত্র রাজনীতি। বিপুল অর্থ ব্যয় করে শিবির পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিজেদের প্যানেলের পক্ষে প্রচারণার মাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। নির্বাচন নিয়ে যখন দক্ষিণ সুরমায় উত্তেজনা বিরাজ করছে, সেই সময়ে এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর হামলা চালায় শিবির। তারা সিলেটে সশস্ত্র মিছিল বের করে। সেপ্টেম্বরের ১৯ ও ২০ তারিখেও শিবির এমসি কলেজে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে ফেলে এবং ছাত্রলীগকে তারা কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়নি। ২০ সেপ্টেম্বর ছিল সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের নির্বাচন। নির্বাচনে শিবিরের ব্যাপক ভরাডুবি হয় এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র সংসদের ১৫টি পদের সবগুলোতে জয়লাভ করে। ১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে শিবিরকর্মীরা এমসি কলেজ ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। এছাড়া সিলেট আলিয়া মাদ্রাসাকে নিজেদের হেডকোয়ার্টার বানিয়ে শিবির নগরীর বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি, মোটরসাইকেল ও টেম্পোযোগে সশস্ত্র মহড়া দিতে শুরু করে। শিবিরের এই আকস্মিক ক্যাম্পাস দখলের ফলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তারা কলেজের আশপাশে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টেম্পোযোগে একদল সশস্ত্র কর্মী নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জড়ো হওয়া জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর চারপাশ থেকে সশস্ত্র হামলা চালায়। মুনিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে কোপাতে তারা রাস্তার পাশে ফেলে রাখে। তপনকে ধরে রেখে বাকিরা পাথর দিয়ে তার শরীর থেতলে দেয়। একই সময়ে ছাত্র সংগ্রম পরিষদের নেতারা এমসি কলেজে প্রবেশে করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। শিবিরের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে আম্বরখানায় স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলকে ধাওয়া করা হয়। জুয়েলের জন্য শিবির স্কুলগুলোতে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছিল না বলে তার ওপর তাদের ক্ষোভ ছিল। অস্ত্রধারী শিবির ক্যাডারদের ধাওয়া খেয়ে স্কুলছাত্র জুয়েল তখন দৌড়ে একটা মার্কেটের ছাদে উঠে যায়। অস্ত্র নিয়ে তার পেছনে পেছনে ধাওয়া করতে থাকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। শিবিরের ধাওয়া খেয়ে নিরুপায় জুয়েল কোনো রাস্তা খোঁজে না পেয়ে মার্কেটের এক ছাদ থেকে পার্শ্ববর্তী ছাদে লাফ দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একাধিক সাবেক ছাত্রনেতা জানান, মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের পর মরহুম জাসদ নেতা ছদরউদ্দিন আহমদ বাদি হয়ে তখন মুনির, তপন, জুয়েল হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইসলামী শিবিরের নেতা জিয়াউদ্দিন নাদের, সায়েফ আহমদ, সোহেল আহমদ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম, আবদুল করিম জলিল এবং অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে মামলা করেন। মুনির ও তপন হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন শামীম সিদ্দিকী, কামকামুর রাজ্জাক রুনু ও বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। মামলা চলাকালীন তারা কেউই আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে এসে সাক্ষী দেননি। তারা আরও জানান, এই মামলায় কামকামুর রাজ্জাক রুনু সাক্ষী দেননি, কারণ মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সুহেল আহমদ চৌধুরী তার আত্মীয় ছিল। মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যা মামলার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন বিষ্ণুপদ চক্রবর্ত্তী। তিনি মামলা চলাকালীন সময়ে সিলেট ছাড়েন। (সি/স-২৪ সেপ্টেম্বর-তা/ই) SHARES অপরাধ বিষয়: