”বহমান জীবন,, কাজী খোরশেদ আলম শের তারিকুল শের তারিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০ এক-দুই করে বয়স বাড়ছে। নদীর স্রোতের মতো জীবনের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। জীবনের রংয়ের সাথে পৃথিবীর রংয়ের পরিবর্তন হয়েছে অনেক। পৃথিবীতে বসবাসকারীদের মনের রংও পরিবর্তন হয়েছে। যোগ-বিয়োগ,গুন-ভাগ আর কত কি খেলা চলছে দেশে দেশে। তবু সময় বয়ে চলছে-জীবন বহমান রয়েছে। কেউ মরছে আবার কেউ মারছে-কেউ কেউ তো রোগে আক্রান্ত হয়ে চির বিদায় নিয়ে যাচ্ছে। এভাবেন সৃষ্টিলগ্ন থেকে আজ অবধি চলছে; আগামী দিনগুলোতে চলতে থাকবে। হয়তো আপনি-আমি কেউ থাকবো না। থাকবে আমাদের কর্মযষ্ণের ইতিহাস। কেউ ভালো কর্মের মাধ্যমে চির অমরত্ব লাভ করে আবার কেউ অপকর্মের কারণে চিরকালের জন্য ঘৃণার পাত্র হয়ে মানব হৃদয়ে জাগ্রত থাকে। এই জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য-ই বা কি: তা আজও জানা হলো না। শুধুমাত্র ছুটে চলছি আপন গতিতে-গন্তব্যহীন কোন মেরুকরণের দিকে। মাটির তৈরী একটি খাঁচায় বন্দি দশায়- কে যেন আটকে আছে; কখনো লাগামহীন ভাবে উড়ে বেড়াতে চায় আবার কখনো বা জিম ধরে বসে থাকে। কখনো মুক্তির গান গায় আবার কখনো পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায়। এই ব্যাপারে লালন শাহ্ তার গানে বলে গেছেন-“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমন আসে যায়।” এই অচিন পাখির সন্ধানে কত কালে কত সাধক ছুটে বেড়িয়েছে বন-বাদার,পাহাড়-পর্বতে,নদী-সাগরের মিলনস্থলে, নদীর তীরে নির্জন কোন পরিবেশে আখড়া স্থাপন করে কাটিয়েছে যুগের পর যুগ। সেই পাখিকে কেউ ধরতে পারছে কি-না, তা আজও রহসাবৃত্ত রয়েছে। মরমি গায়ক হাসান রাজা লিখেছেন-“ লোকে বলে বলে রে, ঘর-বাড়ী বালা না আমার”। ঘর-বাড়ী বলতে সে কোন ঘরের কথা বলেছেন- তা অবশ্য লুকায়িত রয়েছে। দেহের ঘরখানী, না কি নশ^র এই ধরিত্রীর বুকে স্থাপিত ঘর; না পরকালের প্রবেশদ্বার কবর। কারণ মানুষ আজ নশ্বর পৃথিবীর বুকে রঙিণ ঘর বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কে কত তলা বাড়ী বানাতে পারবে, সেই প্রতিযোগীতায় মানুষগুলো যেন পাগল হয়ে গেছে। কার পকেটের টাকা আর কার যে ভূমি। তার কোন হিসাব-নিকাশ নেই। ভূমি দখল কর আর পরের পকেটের টাকা লুট করে আলিশান বাড়ী করতে পারলে-ই, অনেকে মনে করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বাস্তবতা দৃশ্যমান তা সার্বজনীন স্বীকৃত। আপনার একটি সুন্দর বাড়ি থাকলেই আপনি সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত সম্মানীত ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারবেন; প্রকৃত পক্ষে আপনার ব্যক্তিত্ব বলতে যদিও কিছু না থাকে: তাকে কিছুই যায়-আসে না। আমার জানা মতে বর্তমানে কিছু লোকের দাপটে গ্রামের মানুষগুলো স্তব্ধ থাকে। তাদের সামনে ভয়ে কথা বলতে সাহস করে না। কালো টাকার দাপটে তারা এখন সমাজের মধ্যমনি। তাদের ছাড়া কোন সালিসী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় না, কোন সামাজিক কর্মকান্ড সম্পাদন হয় না। কিছু দিন পূর্বেও যে লোকের বাবা মরা মানুষের লাশ বহন করে জীবিকা নির্বাহ করেছে: পরিবারের জন্য ডাল-ভাত যোগার করেছে। আজ সেই লোকের ছেলে সুদের ব্যবসা করে কালো টাকার পাহাড় করেছে। এখন তিনি লাশটানার ছেলে নয়-সমাজপতি। তাকে মন থেকে মানতে পারেন আর না পারেন কিন্ত বিনয়ের সাথে সালাম কালাম করে চলতে হবে। যারা তাকে দু’চক্ষে দেখতে পারত না-এখন তারা সকাল-সন্ধ্যান হাজিরা দেয় আর দু’হাত কড়জোর করে নেক দৃষ্টি কামনা করে। অবস্থা দাঁড়াইছে যে, “যাক জাতি-থাক পিরিতি।” আমরা ছোট বেলায় মুরুব্বিদের মুখে একটি প্রবাদ বাক্য শুনতে পেতাম- “জাতের মেয়ে কালো ভালো/নদীর জল ঘোলা ভালো।” তার মানে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি বা তৈরী করার পূর্বে একটু যাচাই-বাছাই করে নিত যে-যার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন হবে; তার বা তাদের পরিবারের স্বভাব-চরিত্র,আচার-ব্যবহার কেমন। এখন আর সেই বাক্য কেউ মনেই রাখে না অথবা এইসব কথা ভুলেই গেছে। চোর-ডাকাত-হারমাদ,সুদখোর,ঘুষখোর যাই হোক না কেন- টাকার গরম থাকলেই হলো। জাত-পাত বাছ-বিচার করার সময় নেই। আগের মানুষদের জীবন অতিবাহিত হয়েছে এবং এখনের মানুষগুলোর জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। নদীর জলের মধ্যে উপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে; মানব সমাজের জীবনও বহমান রয়েছে। তবে চলাচলের বা প্রবাহের পরির্বতন এসেছে। নদ-নদী,খাল-বিলগুলো ছিল উম্মুক্ত আর এখন সেগুলো ক্রান্বয়ে দখল হয়ে গেছে। প্রায় খালের কিংবা কিছুর নদীর অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেমনি মানুষের নৈতিক চরিত্র নিন্ম থেকে নিন্মমুখি হয়ে অমানুষদের কাতারে সামিল হয়েছে। এখন আমাদের অবস্থা দাঁিড়ছে যে-কাউকে যদি শুয়ারের বাচ্ছা বলে সম্বোধন করে তখন সেই খুব রাগ করে আর যদি বাঘের বাচ্চা বলে সম্বোধন করে তখন খুব খুশি হয়। এখানে গবেষণার বিষয় হলো-শুয়ারের বাচ্চা আর বাঘের বাচ্চা দু’টাই তো জানোয়ার। কিন্ত রাগ হওয়ার আর খুশি হওয়ার কারণ কি? মূল বিষয় হলো: আমরা কোনটা জানোয়ার আর কোনটা জানোয়ার না বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি না অথবা নির্ণয় করতে পারি না। ফলে কোন কোন সময় শুয়ারের বাচ্চাটা বাঘের বাচ্চায় পরিণত হয়। তবে আরেকটা দিক রয়েছে-শুয়র যত নর্দমা খায় এবং নর্দমায় বসবাস করতে ভালোবাসে আর বাঘ জীবন্ত প্রাণীকে হত্যা করে কাঁচা মাংস খায়। সবসময় আক্রমণের ভাব নিয়ে চলে। তাই শুয়ারের বাচ্চা বলে কাউকে সম্বোধন করলে রাগ করে আর বাঘের বাচ্চা বলে সম্বোধন করলে মানুষ রাগ করে না। আবার বাঘের বাচ্চা বললে বীরের মতো অনুভূতির সৃষ্টি হয়। নিজেকে রাজা রাজা মনে হয়। রাজার ভাব নিয়ে বাঘের বাচ্চা জানোয়ারগুলো পৃথিবীতে যত অপর্কম রয়েছে-সবই সম্পাদন করে। বাঘকে তো আর চাইলেই প্রতিরোধ করতে পারে না। প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা থাকলেও শুধুমাত্র হুমকারের ভয়ে ভীতু হয়ে থাকে। যেন নিজের ঘাড়টি রক্ষা পায় কিন্ত খোলসধারী বাঘ সুযোগ পেলে সকলের ঘাড়ই কামড়ে ধরে। যাক বহমান জীবন নিয়ে কথা বলছিলাম। কিভাবে যে জীবনের শুরু হলো আর কিভাবে যে শেষ হবে-সেই সূত্র, তথ্য-উপাত্ত খোঁজে লাভ নেই। এসব তথ্যের সন্ধান এই জীবনে খোঁজে পাব না। তবু তো বয়ে চলছে জীবন তরী। কোথায় নোঙর করব, ঠিক ঠাক করতে পারছি না। জীবনতরী জলের উপর আর ভাসতে পারছে না। দিনে দিনে বোঝা বাড়ছে। শরীরের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা টিম টিম করে জ¦লছে; কখন যে ঝড়ো হাওয়ায় নিভিয়ে দিয়ে যায়- তা উপলব্ধি করার ফুসরত নেই। সততার কবর রচনা কর; না অপকর্মের বাসর সাজাব; তা নিয়ে দিবা-রাত্রীর অন্তঃস্থলে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের ফলাফল সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এই যুদ্ধ দীর্ঘ সময়ের-ক্ষণিকের নয়। না জানি, অসমাপ্ত যুদ্ধ ক্ষেত্রে থেকে পলায়ন করতে হয়-আপন অস্থিত্বে ডাকে সাড়া দিয়ে। জানি,আমাকে দিয়ে কোন কিছুই সমাধান হবে না। শুধু শুধু বিবেকের ময়দানের যুদ্ধে বন্ধি হয়ে হৃদয়ের কারাগারে নিষ্পেষিত হবো। ধ্বংস তো হবোই না- দেহের অণু-পরমানুর টুকরো গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে যাব ভমান্ডের স্তরে স্তরে। যেখানে টুকরো গুলো ছিটিয়ে পড়বে,যেখান থেকেই নতুন চারা গজাবে। হয়তো তা থেকে নতুন পৃথিবীর সূর্য উদয় হবে। অথবা বিষাক্ত কার্বণ প্রবাহের ফলে সব নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। এর মাঝেও জীবনের অস্থিত্ব থাকবে-বহমান থাকবে জীবন। লেখক কাজী খোরশেদ আলম সাধারণ সম্পাদক বুড়িচং প্রেস ক্লাব,বুড়িচং,কুমিল্লা। SHARES সাহিত্য বিষয়: